Hanuman Chalisa Chaupai 8 Meaning in Bengali
Each verse of the Hanuman Chalisa Meaning narrates an aspect of Hanuman’s divine qualities.
Hanuman Chalisa Chaupai 8 in Bengali with Meaning & Analysis
প্রভু চরিত্র সুনিবে কো রসিয়া।
রাম লখন সীতা মন বসিয়া॥
সারানুবাদ : প্রভুকথা শোনার রসিক, রাম লক্ষ্মণ ও সীতার হৃদয়ে বা মনে বাস করেন।
ব্যাখ্যা : ভক্তের হৃদয়ে যখন প্রভুর বাস হয়, ভক্ত যখন তার লালসাসিক্ত ব্যাকুলতায় তার প্রভুকে হৃদয়ে অনুভব করেন, বুঝতে হবে সেই ভক্তের ভক্তি মার্গের যাত্রার সঠিক প্রারম্ভ হয়েছে। আর যদি প্রভুর হৃদয়ে ভক্তের নিবাস হয় তবে বুঝতে হবে যে তিনি (ভক্ত) ভক্তিমার্গের উচ্চতম শিখরে পৌঁছেছেন।
প্রভুর সাথে একাত্ম হবার নবধা ভক্তির যে শৃঙ্খলা প্রভু নিজ মুখে ব্যক্ত করেছেন তার মধ্যে প্রথমটি হলো ‘শ্রবণ’। আর শ্রীহনুমানজী এই শ্রবণকেই তাঁর জীবনের আধার বানিয়েছেন। প্রভু শ্রীরামের কথা, তাঁর কীর্তন, তাঁর যশোগাথা যেখানে, শ্রীহনুমানজী সদা সেইখানে পৌঁছে যান সেই অমৃতময় রস পান করার জন্য।
বাল্মীকি রামায়ণে এই প্রসঙ্গে ভারী সুন্দর এক ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রভু শ্রীরাম অযোধ্যায় ফিরে এসেছেন এবং তাঁর রাজ্যাভিষেকও হয়ে গেছে। বানররাজ সুগ্রীব, অঙ্গদ, ঋক্ষরাজ জাম্ববান, নল, নীল ও অন্যান্যদের এবার বিদায় নেবার পালা। প্রভু সবাইকে সুন্দর উপহার ও তাদের মনোবাঞ্ছিত বর দিলেন। প্রভু শ্রীহনুমানজীর খোঁজ করলেন। শ্রীহনুমানজী যথারীতি রামনামে মগ্ন হয়ে চোখ বুজে ছিলেন। প্রভুর ডাকে তিনি মুহূর্তে প্রভুর কাছে উপস্থিত হলেন। প্রভু অত্যন্ত স্নেহের সম্ভাষণে শ্রীহনুমানজীকে তাঁর ইচ্ছামত বর প্রার্থনা করতে বললেন। শ্রীহনুমানজী তাঁর ইচ্ছা প্রকাশ করে বললেন –
যাবদ্ রামকথা বীর চরিষ্যতি মহীতলে।
তাবচ্ছরীরে বৎস্যন্তু প্রাণা মম ন সংশয়ঃ।।
অর্থাৎ, হে বীর, এই পৃথিবীতে যত দিন রামকথা প্রচলিত থাকবে, ততদিন যেন নিঃসন্দেহে আমার প্রাণ, আমার শরীরে বাস করে। শ্রীহনুমানজীর এই কথা শুনে প্রভু সিংহাসন থেকে উঠে এসে শ্রীহনুমানজীকে তাঁর বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “হে কপিশ্রেষ্ঠ, কোনো সংশয় রেখোনা, এই রকমই হবে।
এই সংসারে আমার কথা যতদিন প্রচলিত থাকবে ততদিন তোমার কীর্তি অটুট থাকবে আর তোমার শরীরে প্রাণও থাকবে। আর যতদিন এই ভূলোক থাকবে, ততদিন আমার কথাও সদা বিরাজমান হবে।” এই ঘটনার পুষ্টি মহাভারতেও পাওয়া যায়। যখন বনবাসের সময় পাণ্ডবদের শ্রীহনুমানজীর দর্শন হয় তখন পাণ্ডবদের অনুরোধে শ্রীহনুমানজী তাঁদের রামকথা শুনালে, সেই কথা প্রসঙ্গে এই ঘটনার উল্লেখ করেন। তাই গোস্বামীজী ‘শ্রীহনুমৎ-স্তবনে’ দীপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করে তার প্রণাম জানিয়ে বললেন –
যত্র যত্র রঘুনাথ কীর্তনং তত্র তত্র কৃতমস্তকাঞ্জলিম্।
বাষ্পবারিপরিপূর্ণলোচনং মারুতিং নমত রাক্ষসান্তকম্।।
অর্থাৎ যেখানে যেখানে শ্রীরঘুনাথের কীর্তন হয়, সেখানে সেখানে হাতজোড় করে অশ্রুপূর্ণ চোখে মাথা ঝুঁকিয়ে রাক্ষসদের শেষ করার কার্য সম্পন্ন করা বায়ুপুত্র শ্রীহনুমানজীকে আমি আমার প্রণাম জানাচ্ছি।
প্রভু শ্রীরামের কথা তাঁর যে কত প্রিয় তা আবার প্রমাণ হলো যখন প্রভু তাঁর লীলা সংবরণ করার জন্য সরযূ নদীতে অযোধ্যাবাসীদের নিয়ে প্রবেশ করার আগে শ্রীহনুমানজীকে তাঁর সঙ্গ নেওয়ার কথা বললে, শ্রীহনুমানজী অত্যন্ত বিনীত কিন্তু ব্যথিত হৃদয়ে বললেন, “প্রভু, আপনার কথা ছেড়ে আমি কোথাও যেতে চাই না।” প্রভু কপট রাগ দেখিয়ে বললেন, “হনুমান, তুমি আমায় ছেড়ে আমার কথার জন্য যেতে চাইছো না ?” শ্রীহনুমানজীর উত্তর তো দেখুন।
এই রকম উত্তর শ্রীহনুমানজীর মতন জ্ঞানবান ভক্ত শিরোমণিই দিতে পারেন। শ্রীহনুমানজী বললেন, “‘হে প্রভু, আপনি যেখানেই থাকুন, সেখানে যে আপনার কথা হবেই এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু আপনার কথা যেখানে হয়, সেখানে আপনি যে উপস্থিত হবেনই, তা একেবারে নিশ্চিত। তাই আমি এখানেই থাকতে চাই। হে প্রভু, আপনিই তো বলেছেন যে আমি বৈকুণ্ঠ বা যোগীদের হৃদয়ে বাস করি না, কিন্তু হে নারদ, যেখানে আমার ভক্ত আমার কথা বা গান করেন, আমি সেখানেই অবস্থান করি।”
আমরা প্রভুর ভজন, তাঁর কথা এইজন্য শুনি বা করি যাতে কোনো না কোনো সময়ে প্রভুর চিন্ময়লোকে তাঁর সঙ্গ করতে পারি। আর শ্রীহনুমানজী প্রভুর আগ্রহ সত্ত্বেও তাঁর লোকে যেতে চাইছেন না এইজন্য যে তাঁর কথা বা গান তিনি এই লোকে শোনার আনন্দ থেকে যাতে বঞ্চিত না হন।
মানুষের স্বভাব হলো সে যে বিষয়ে ‘রস’ পায়, যেভাবেই হোক সেই বিষয়ের ‘রস’ লাভের সুযোগ কোনোমতেই হারাতে চায় না বা ‘রসিক’ মন সব বাধা পেরিয়ে সেখানে পোঁছতে চেষ্টা করে। শ্রীহনুমানজীও প্রভুর কথা বা চরিত্র ‘শুনিবে কো রসিয়া’ অর্থাৎ প্রভু শ্রীরামের কথা শোনার একটিও সুযোগ নষ্ট করেন না তা সে যতই প্রতিকূল পরিস্থিতি হোক।
শ্রীশ্রীরামচরিতমানসে লঙ্কাকাণ্ডের একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করা খুবই প্রাসঙ্গিক হবে। প্রভু শ্রীরাম ও রাবণের সৈন্যদের মধ্যে যুদ্ধ তখন ভীষণ পর্যায়ে। ভাই লক্ষ্মণ রাবণপুত্র মেঘনাদের শক্তিশেল বাণের আঘাতে অচেতন হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পড়ে আছেন আর প্রভু শ্রীরাম ভাইয়ের জন্য বিলাপ করে চলেছেন। প্রবীণ জাম্ববানের কথায় শ্রীহনুমানজী বৈদ্য সুষেণকে এনে তার কথা মতো সঞ্জীবনী বুটির সন্ধানে হিমালয় পর্বতের পথে রওনা হয়েছেন। তাঁর বায়ুর গতি তাঁকে মুহূর্তে হিমালয়ের পাদদেশে পোঁছে দিয়েছে।
যেহেতু ভক্তশিরোমণি শ্রীহনুমানজীর রামকথা শোনার আগ্রহ সবার জানা, তাই রাবণের পরামর্শে রাক্ষসবীর ‘কালনেমী’ আগে থেকে গিয়ে হিমালয়ের পাদদেশে তাঁর মায়াবী শক্তির দ্বারা এক মনোরম গুহায় মুনির বেশ ধরে প্রভু শ্রীরামের যশোগান করতে লাগলো।
কালনেমির উদ্দেশ্য হলো, এই ‘রাম-ভজন’ ও ‘রামকথা’য় শ্রীহনুমানজীকে আটকে রাখা যাতে রাত্রিশেষে লক্ষ্মণের মৃত্যু হয়। বৈদ্যরাজ সুষেণ শ্রীহনুমানজীকে আগেই বলে রেখেছিলেন যে, সূর্যোদয়ের আগে সঞ্জীবনী বুটির রস লক্ষ্মণকে সেবন করাতে হবে নচেৎ তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত।
শ্রীহনুমানজীর শ্রীরাম-কথা অনুরাগের খবর সর্বত্র এমনকি লঙ্কাপুরীতেও পোঁছে গিয়েছিল। যাই হোক, মারুতনন্দন শ্রীহনুমান আকাশ-মার্গ থেকেই সেই মনোরম আশ্রম দেখতে পেলেন। সেখানে সরোবর, মনোরম ফুলের বাগান দেখে তাঁর মনে হলো এই আশ্রমের যিনি স্বামী, সেই মুনি নিশ্চয়ই তাঁকে জলের সন্ধান দিতে পারবেন কারণ সারাদিনের যুদ্ধের শ্রান্তির পর তিনি খুবই তৃষ্ণার্ত ছিলেন। তাই তিনি সেই মায়াময় আশ্রমে নেমে মুনির চরণে তাঁর প্রণাম নিবেদন করলেন।
সেই মুনি তাঁকে কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে রামকথা বলেই চললেন। কালনেমি একথাও জানতেন যে শ্রীহনুমানজী রামকার্য ও রামকথার মধ্যে রামকথাকেই সদাই প্রাধান্য দেন। দুষ্ট কালনেমি আরও জানতেন যে, শ্রীহনুমানজী রামকথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্থান ত্যাগ করবেন না। কালনেমির এই ছল কিন্তু বেশ কাজে লেগে গেলো।
প্রভু শ্রীরামের কথা শ্রীহনুমানজীর এত প্রিয় যে কালনেমির শিষ্টাচার সম্বন্ধীয় ভুল তাঁর নজর এড়িয়ে গেলো এবং যার জন্য এই আশ্রমে নামা অর্থাৎ তৃষ্ণা নিবারণের জন্য জলের খোঁজ করা, তাও তিনি ভুলে গেলেন। রামকথা তাঁর শরীরের ক্লান্তি ও তৃষ্ণা ভুলিয়ে দিলো। শ্রীমদ্ভাগবত কথা শ্রবণের সময়ও মহারাজ পরীক্ষিতের খিদে-তৃষ্ণা সাতদিনের জন্য একেবারে নিস্তেজ হয়ে গিয়েছিলো।
শ্রীহনুমানজী রামকথায় এমন লীন হয়ে গেলেন যে তিনি তাঁর মূল উদ্দেশের কথা অর্থাৎ সঞ্জীবনী বুটি আনার কথা ভুলে গেলেন। মূল্যবান সময় পেরিয়ে যেতে লাগলো। শ্রীহনুমানজীর মন, চিত্ত সব রামকথায় একাত্ম হয়ে গেলো। ওদিকে সময় পেরিয়ে যাচ্ছে দেখে প্রভু শ্রীরাম ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। এদিকে রামকথার প্রসঙ্গে যখন যুদ্ধলীলার বর্ণনা শুরু হলো, কালনেমি তার দেখা যুদ্ধকথা বর্ণনা করতে লাগলেন কিন্তু তার দেখার সামর্থ্য সীমিত ছিল। তাই তার কথা হঠাৎ করে অন্য প্রসঙ্গে যেতে লাগলো এবং কালনেমি তখন তার নিজের প্রশংসায় তার ত্রিকালদর্শী হওয়া এবং অসাধারণ গুণসমূহের বর্ণনা শুরু করা মাত্রই শ্রীহনুমানজীর রামকথা শোনার একাগ্রতা ভঙ্গ হয়ে গেল এবং তাঁর তৃষ্ণার্ত হওয়া ও জলের অনুসন্ধানের কথা মনে পড়লো। কালনেমি তাঁকে নিকটবর্তী জলাশয়ে জলপান ও ক্লান্তি দূর করার জন্য বললে শ্রীহনুমানজী সেই সরোবরে জল পান করতে নামলেন এবং জলে অবগাহন করে ক্লান্তি দূর করার জন্য প্রচেষ্টা করা মাত্র এক শাপিত অপ্সরা যে কিনা ওই সরোবরে কুমীরের রূপে বিরাজ করছিল, তার আক্রমণের মুখে পড়লেন।
শ্রীহনুমানজীর দ্বারা তার বধ ও উদ্ধার হওয়ায় সেই অপ্সরা তাঁকে মুনিবেশে কালনেমির কথা জানালেন। শ্রীহনুমানজী তারপর কালনেমিকে বধ করে দ্রোণপর্বতকেই উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে লক্ষ্মণের প্রাণ উদ্ধারের কাজ করলেন।
কালনেমি প্রভু শ্রীরামের অনেক কথা জানতেন না আর যদি জানতেন তাহলে শ্রীহনুমানজীকে সারা রাত্রিই এই কথায় আটকে রাখতে পারতেন। প্রশ্ন হচ্ছে তা হলে কি হতো ? এই ঘটনা থেকে আমরা এই বিশ্বাস নিতে পারি যে রামভজন বা রামকথা অনুরাগীর কথা বা ভজন তন্ময়তা কখনই তার অন্য কাজ বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ যে শ্রীহনুমানজীর কোনো কাজ কখনও বাধাপ্রাপ্ত হয়ে বিগড়ে যায়নি।
গোস্বামী তুলসীদাসজীর মারুত-নন্দনের রামকথাপ্রীতির তো প্রত্যক্ষ দর্শন হয়েছিল। সেই ঘটনার কথা আমাদের অনেকেরই জানা যে কাশীর প্রহ্লাদ ঘাটে শ্রীহনুমানজীর সাক্ষাৎ দর্শন তার হয়েছিল এই কথা জেনে যে শ্রীহনুমানজী ওই ঘাটে হওয়া রামকথায় সর্বপ্রথম আসতেন এবং সবার শেষে যেতেন।
গোস্বামীজী তাঁর শ্রীশ্রীরামচরিতমানসে মঙ্গলাচরণে যখন সব পূজনীয় চৈতন্যস্বরূপদের গুণ ও তাঁদের বিশিষ্ট লক্ষণগুলির সঙ্গে আমাদের পরিচয় করাচ্ছেন, তখন শ্রীহনুমানজীর ও শ্রীবাল্মীকির পরিচয় করাতে গিয়ে শ্রীহনুমানজীর ও শ্রীবাল্মীকির বিষয়ে বললেন যে এঁরা “সীতারামগুণগ্রাম পুণ্যারণ্য বিহারী”, অর্থাৎ এই দুজন প্রভু শ্রীরাম এবং মাতা সীতার গুণসমূহরূপ পুণ্যময় অরণ্য ছেড়ে কখনও কোথাও যান না।
দুজনের তফাৎ শুধু এই যে জঙ্গলে দস্যুগিরিরত একজন দেবর্ষি নারদের কৃপাপ্রাপ্ত হয়ে শুধু রামনামের জপ ও কঠোর তপশ্চর্যার ফলস্বরূপ মহর্ষি বাল্মীকিরূপে জগতে পরিচিত হন আর অন্যজন জন্ম থেকেই “’সীতারামগুণগ্রাম পুণ্যারণ্য বিহারী”, কেননা স্বয়ং ভগবান শিব প্রভু শ্রীরামকে ভক্তি করবার জন্য একাদশ রুদ্র অবতার হয়ে জন্মগ্রহণ করেন। এই কারণে শ্রীহনুমানজীর রামকথা ও ভজন অনুরাগ জন্মসিদ্ধ ও স্বভাবসিদ্ধ। তার মধ্যে শ্রবণ, সৎকর্ম এবং সমর্পণের ত্রিধারা সম্মিলিত হওয়ায় শ্রীহনুমানজী প্রভু শ্রীরাম, মাতা সীতা ও লক্ষ্মণের হৃদয়ে সদা বিরাজ করেন।