BhaktiVed

Hanuman Chalisa in Bengali Pdf, Hanuman Chalisa Lyrics in Bengali, Hanuman Chalisa Meaning in Bengali

Chalisa2023-10-24

উদাহরণ স্বরূপ হনুমান চালীসার ‘চালীসা’র প্রচলন কবে থেকে, কোথায় লেখা হয়েছিল, লেখার সময়কাল, চালীসাই বা কেন, উনচল্লিশ বা একচল্লিশ নয় কেন ইত্যাদি? প্রশ্ন আরও আছে, যেমন কেন বলা হয় শ্রীহনুমানজীর সাধনা হল ‘হনুমান চালীসা’ পাঠ ? আজ থেকে পাঁচশো বছর আগে লেখা এই ‘চালীসা’ সময়ের সাথে সাথে তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়াচ্ছে এবং বহু মানুষের এই ‘চালীসা’ পাঠের হাতেনাতে ফল পাওয়ার প্রচুর খবরও আসছে। এটা ঘটছে কেন ? রহস্যটা কী ?

Hanuman Chalisa Bengali Pdf, Hanuman Chalisa Bengali Lyrics, Hanuman Chalisa in Bengali Version Meaning

Also Read Hanuman Chalisa in English

হনুমান চালীসা
দোঁহা

শ্রীগুরু চরন সরোজ রজ, নিজ মনু মুকুরু সুধারি।
বরনউঁ রঘুবর বিমল জসু, জো দায়কু ফল চারি॥
বুদ্ধিহীন তনু জানিকে, সুমিরৌঁ পবন-কুমার।
বল বুধি বিদ্যা দেহু মোহিঁ, হরহু কলেস বিকার॥

চৌপাঈ

জয় হনুমান জ্ঞান গুন সাগর। জয় কপীস তিহুঁ লোক উজাগর ॥ ১ ॥
রাম দূত অতুলিত বল ধামা। অঞ্জনি-পুত্র পবনসুত নামা ॥ ২ ॥
মহাবীর বিক্রম বজরঙ্গী। কুমতি নিবার সুমতি কে সঙ্গী ॥ ৩ ॥
কঞ্চন বরন বিরাজ সুবেসা। কানন কুণ্ডল কুঞ্চিত কেসা ॥ ৪ ॥
হাথ বজ্র ঔ ধ্বজা বিরাজৈ। কাঁধে মূঁজ জনেঊ সাজৈ ॥ ৫ ॥

Hanuman Chalisa Lyrics in Bengali Pdf

শঙ্কর সুবন কেসরীনন্দন। তেজ প্রতাপ মহা জগ বন্দন ॥ ৬ ॥
বিদ্যাবান গুনী অতি চাতুর। রাম কাজ করিবে কো আতুর ॥ ৭ ॥
প্রভু চরিত্র সুনিবে কো রসিয়া। রাম লখন সীতা মন বসিয়া ॥ ৮ ॥
সূক্ষ্ম রূপ ধরি সিয়হিঁ দিখাবা। বিকট রূপ ধরি লঙ্ক জরাবা ॥ ৯ ॥
ভীম রূপ ধরি অসুর সঁহারে। রামচন্দ্র কে কাজ সঁবারে ॥ ১০ ॥

Hanuman Chalisa Lyrics Bengali

লায় সজীবন লখন জিয়ায়ে। শ্রীরঘুবীর হরষি উর লায়ে ॥ ১১ ॥
রঘুপতি কীন্হী বহুত বড়াঈ। তুম মম প্রিয় ভরতহি সম ভাঈ ॥ ১২ ॥
সহস বদন তুম্হরো জস গাবৈঁ। অস কহি শ্রীপতি কণ্ঠ লগাবৈঁ ॥ ১৩ ॥
সনকাদিক ব্রহ্মাদি মুনীসা। নারদ সারদ সহিত অহীসা ॥ ১৪ ॥
জম কুবের দিগপাল জহাঁ তে। কবি কোবিদ কহি সকে কহাঁ তে ॥ ১৫ ॥

Hanuman Chalisa Bengali Lyrics

তুম উপকার সুগ্রীবহিঁ কীন্হা। রাম মিলায় রাজ পদ দীন্হা ॥ ১৬ ॥
তুম্হরো মন্ত্র বিভীষন মানা। লঙ্কেস্বর ভএ সব জগ জানা ॥ ১৭ ॥
জুগ সহস্র জোজন পর ভানূ। লীল্যো তাহি মধুর ফল জানূ ॥ ১৮ ॥
প্রভু মুদ্রিকা মেলি মুখ মাহীঁ। জলধি লাঁঘি গয়ে অচরজ নাহীঁ ॥ ১৯ ॥
দুর্গম কাজ জগত কে জেতে। সুগম অনুগ্রহ তুম্হরে তেতে ॥ ২০ ॥

Hanuman Chalisa in Bengali Lyrics

রাম দুআরে তুম রখবারে। হোত ন আজ্ঞা বিনু পৈসারে ॥ ২১ ॥
বিশদ অর্থ ও ব্যাখ্যা সহ সঙ্কটমোচনকারী হনুমান চালীসা
সব সুখ লহৈ তুম্হারী সরনা। তুম রচ্ছক কাহূ কো ডর না ॥ ২২ ॥
আপন তেজ সম্হারো আপৈ। তীনোঁ লোক হাঁক তেঁ কাঁপৈ ॥ ২৩ ॥
ভূত পিসাচ নিকট নহিঁ আবৈ। মহাবীর জব নাম সুনাবৈ ॥ ২৪ ॥
নাসৈ রোগ হরৈ সব পীরা। জপত নিরন্তর হনুমত বীরা ॥ ২৫ ॥

Bengali Hanuman Chalisa

সঙ্কট তেঁ হনুমান ছুড়াবৈ। মন ক্রম বচন ধ্যান জো লাবৈ ॥ ২৬ ॥
সব পর রাম তপস্বী রাজা। তিন কে কাজ সকল তুম সাজা ॥ ২৭ ॥
ঔর মনোরথ জো কোঈ লাবৈ। সোই অমিত জীবন ফল পাবৈ ॥ ২৮ ॥
চারোঁ জুগ পরতাপ তুম্হারা। হৈ পরসিদ্ধ জগত উজিয়ারা ॥ ২৯ ॥
সাধু-সন্ত কে তুম রখবারে। অসুর নিকন্দন রাম দুলারে ॥ ৩০ ॥

Hanuman Chalisa Meaning in Bengali

অষ্ট সিদ্ধি নৌ নিধি কে দাতা। অস বর দীন জানকী মাতা ॥ ৩১ ॥
রাম রসায়ন তুম্হরে পাসা। সদা রহো রঘুপতি কে দাসা ॥ ৩২ ॥
তুম্হরে ভজন রাম কো পাবৈ। জনম-জনম কে দুখ বিসরাবৈ ॥ ৩৩ ॥
অন্তকাল রঘুবর পুর জাঈ। জহাঁ জন্ম হরি-ভক্ত কহাঈ ॥ ৩৪ ॥
ঔর দেবতা চিত্ত ন ধরঈ। হনুমত সেই সর্ব সুখ করঈ ॥ ৩৫ ॥

Hanuman Chalisa Bengali Meaning

সঙ্কট কটৈ মিটৈ সব পীরা। জো সুমিরৈ হনুমত বলবীরা ॥ ৩৬ ॥
জয় জয় জয় হনুমান গোসাঈঁ। কৃপা করহু গুরুদেব কী নাঈঁ ॥ ৩৭ ॥
জো সত বার পাঠ কর কোঈ। ছূটহি বন্দি মহা সুখ হোঈ ॥ ৩৮ ॥
জো য়হ পঢ়ৈ হনুমান চালীসা। হোয় সিদ্ধি সাখী গৌরীসা ॥ ৩৯ ॥
তুলসীদাস সদা হরি চেরা। কীজৈ নাথ হৃদয় মহঁ ডেরা ॥ ৪০ ॥

দোঁহা

পবনতনয় সঙ্কট হরন, মঙ্গল মূরতি রূপ।
রাম লখন সীতা সহিত, হৃদয় বসহু সুর ভূপ॥

হনুমান চালীসা

দোহা

শ্রীগুরু চরন সরোজ রজ, নিজ মনু মুকুরু সুধারি।
বরনউঁ রঘুবর বিমল জসু, জো দায়কু ফল চারি॥

বুদ্ধিহীন তনু জানিকে, সুমিরৌঁ পবন-কুমার।
বল বুধি বিদ্যা দেহু মোহিঁ, হরহু কলেস বিকার॥

শ্রীগুরুর চরণকমলের পরাগের দ্বারা (অর্থাৎ শ্রীগুরুর চরণধূলির দ্বারা)
নিজের মনরূপ দর্পণ পরিষ্কার করে নিয়ে রঘুবর শ্রীরামচন্দ্রের বিমল যশ বর্ণনা করতে

প্রবৃত্ত হচ্ছি। শ্রীরামের এই কীর্তিগাথা ধর্ম, অর্থ, কাম এবং মোক্ষ- এই চতুর্বিধ পুরুষার্থই প্রদান করে। কিন্তু আমি যে নিতান্তই নির্বোধ (সুতরাং এই কর্মে অক্ষম) তা বুঝে পবননন্দন হনুমানকে স্মরণ করছি – প্রভু, আপনি কৃপা করে আমায় বল, বুদ্ধি এবং বিদ্যা দান করুন, আমার সর্বপ্রকার ক্লেশ এবং তজ্জনিত বিকারসমূহ হরণ করুন ।

চৌপাঈ

জয় হনুমান জ্ঞান গুন সাগর। জয় কপীস তিহুঁ লোক উজাগর॥
হে হনুমান, হে কপি শ্রেষ্ঠ, আপনার জয় হোক। জ্ঞান ও গুণের সাগর স্বরূপ আপনি, ত্রিভুবনেই উজ্জ্বল (প্রসিদ্ধ) আপনার নাম॥ ১।

রাম দূত অতুলিত বল ধামা। অঞ্জনি-পুত্র পবনসুত নামা॥
আপনি শ্রীরামের দূত, অতুলনীয় আপনার বল ও তেজ। অঞ্জনার পুত্র আপনি,
পবন-নন্দন নামেও আপনি পরিচিত ॥ ২॥

মহাবীর বিক্রম বজরঙ্গী। কুমতি নিবার সুমতি কে সঙ্গী॥
মহান বীর, মহাবিক্রমশালী, বজ্রাঙ্গবলী আপনি কুমতির নিবারণকর্তা এবং শুভবুদ্ধির সঙ্গী (অর্থাৎ শুভ বুদ্ধি প্রদানকারী) ॥ ৩॥

কঞ্চন বরন বিরাজ সুবেসা। কানন কুণ্ডল কুঞ্চিত কেসা॥
স্বর্ণবর্ণ দেহে শোভন বেশে, কর্ণে কুণ্ডল এবং কুঞ্চিত কেশের শোভায় দর্শনীয় আপনার রূপ ॥ ৪ ॥

হাথ বজ্র ঔ ধ্বজা বিরাজৈ। কাঁধে মূঁজ জনেঊ সাজৈ॥
আপনার হস্তে বজ্র এবং ধ্বজা বিরাজিত, স্কন্ধে মুঞ্জাতৃণ নির্মিত উপবীত শোভমান ॥৫॥

Hanuman Chalisa in Bengali Meaning

শঙ্কর সুবন কেসরীনন্দন। তেজ প্রতাপ মহা জগ বন্দন॥
মহাদেবের অংশে জাত আপনি, বানর-শ্রেষ্ঠ কেশরী আপনার পিতা। তেজস্বিতায় এবং প্রতাপে আপনি সর্বজগতে পূজনীয় ॥৬॥

বিদ্যাবান গুনী অতি চাতুর। রাম কাজ করিবে কো আতুর॥
সর্বপ্রকার বিদ্যা ও সকল গুণে ভূষিত আপনি উদ্দেশ্যসাধনে অতিশয় দক্ষ ও
চতুর, বিশেষতঃ শ্রীরামের কার্য-সম্পাদনে আপনি সর্বদাই তৎপর ॥৭॥

প্রভু চরিত্র সুনিবে কো রসিয়া। রাম লখন সীতা মন বসিয়া॥
প্রভু শ্রীরামচন্দ্রের চরিতকথার রসগ্রাহী শ্রোতা আপনি, আপনার হৃদয়ে শ্রীরাম, লক্ষ্মণ এবং সীতার নিত্য বসতি ॥৮॥

সূক্ষ্ম রূপ ধরি সিয়হিঁ দিখাবা। বিকট রূপ ধরি লঙ্ক জরাবা॥
ভীম রূপ ধরি অসুর সঁহারে। রামচন্দ্র কে কাজ সঁবারে॥

সীতাদেবীর কাছে আপনি ক্ষুদ্র দেহ ধারণ করে দেখা দিয়েছিলেন, লঙ্কা-দহনের সময় বিকট আকার ধারণ করেছিলেন, রাক্ষসদের সংহারকালে আপনার রূপ অতি ভয়ঙ্কর, এইভাবে শ্রীরামচন্দ্রের কার্যোদ্ধারের জন্য আপনি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রূপ ধারণ করেন। ৯-১০॥

Hanuman Chalisa in Bengali Version

লায় সজীবন লখন জিয়ায়ে। শ্রীরঘুবীর হরষি উর লায়ে॥
রঘুপতি কীন্হী বহুত বড়াঈ। তুম মম প্রিয় ভরতহি সম ভাঈ॥
সহস বদন তুম্হরো জস গাবৈঁ। অস কহি শ্রীপতি কণ্ঠ লগাবৈঁ॥

মৃতসঞ্জীবনী ওষধি নিয়ে এসে, আপনি শ্রীলক্ষ্মণকে পুনর্জীবিত করেন, (আপনার এই অসামান্য কর্মকুশলতা দর্শনে) আনন্দিত চিত্তে শ্রীরাম আপনাকে বক্ষে জড়িয়ে ধরেন। রঘুপতি আপনার অশেষ প্রশংসা করেন এবং বলেন, ‘তুমি ভরতেরই মতো আমার পরম প্রিয় ভ্রাতা। সহস্র মুখে তোমার যশ কীর্তিত হবে’-এই কথা বলে শ্রীরাম আপনাকে কণ্ঠলগ্ন করেন॥ ১১-১৩॥

সনকাদিক ব্রহ্মাদি মুনীসা। নারদ সারদ সহিত অহীসা॥
জম কুবের দিগপাল জহাঁ তে। কবি কোবিদ কহি সকে কহাঁ তে॥

ব্রহ্মাদি দেবশ্রেষ্ঠগণ, স্বয়ং দেবী সরস্বতী, সনকাদি মুনিচতুষ্টয়, অনন্তনাগ, নারদ-সহ অন্যান্য ঋষিবৃন্দ, যম-কুবেরাদি দিক্পালগণ ও কবিশ্রেষ্ঠ তথা জ্ঞানিবৃন্দ আপনার মহিমা বর্ণনা করে উঠতে পারেন না॥ ১৪-১৫॥

Hanuman Chalisa Bengali Version

তুম উপকার সুগ্রীবহিঁ কীন্হা। রাম মিলায় রাজ পদ দীন্হা॥
আপনি সুগ্রীবের সঙ্গে রামের মিলন ঘটিয়ে তাঁকে রাজপদে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে তাঁর পরম উপকার সাধন করেছিলেন॥ ১৬॥

তুম্হরো মন্ত্র বিভীষন মানা। লঙ্কেস্বর ভএ সব জগ জানা॥
বিভীষণ আপনার পরামর্শ মেনেছিলেন এবং তার ফলে পরিণামে তিনি লঙ্কার অধীশ্বর হয়েছিলেন, একথা জগতের সকলেই জানে॥ ১৭॥

জুগ সহস্র জোজন পর ভানূ। লীল্যো তাহি মধুর ফল জানূ॥
যুগ-সহস্র যোজন দূরে অবস্থিত যে সূর্যদেব, তাঁকে আপনি মিষ্ট ফলজ্ঞানে গ্রহণ করতে উদ্যত হয়েছিলেন॥ ১৮॥

প্রভু মুদ্রিকা মেলি মুখ মাহীঁ। জলধি লাঁঘি গয়ে অচরজ নাহীঁ॥
প্রভু শ্রীরামচন্দ্রের নামাঙ্কিত অঙ্গুরীয়ক মুখের মধ্যে নিয়ে আপনি সাগর লঙ্ঘন করে পরপারে গেছিলেন-এতে আশ্চর্যের কিছুই নেই (কারণ বাল্যকালেই আপনি সূর্যকে ধরতে লাফ দিয়েছিলেন) ॥ ১৯ ॥

দুর্গম কাজ জগত কে জেতে। সুগম অনুগ্রহ তুম্হরে তেতে॥
জগতে যত দুষ্কর কাজ আছে, সবই আপনার কৃপায় সহজসাধ্য হয়ে ওঠে ॥ ২০॥

Hanuman Chalisa in Bengali Translation

রাম দুআরে তুম রখবারে। হোত ন আজ্ঞা বিনু পৈসারে॥
শ্রীরামের দ্বারে আপনিই রক্ষক, আপনার অনুমতি ব্যতীত কেউই সেখানে প্রবেশ করতে পারে না (অর্থাৎ আপনার কৃপা ব্যতীত ভগবান রামের প্রতি ভক্তি লাভ হয় না)॥ ২১॥

সব সুখ লহৈ তুম্হারী সরনা। তুম রচ্ছক কাহূ কো ডর না॥ যে আপনার শরণ নেয়, সে সর্বসুখ লাভ করে; আপনি যাকে রক্ষা করেন কারো কাছ থেকেই তার ভয় থাকে না ॥২২॥

আপন তেজ সম্হারো আপৈ। তীনোঁ লোক হাঁক তেঁ কাঁপৈ।। আপনার তেজ একমাত্র আপনিই সম্বরণ করতে পারেন (অন্য কেউ আপনার তেজ নিবারণ করতে পারে না)। আপনার হুঙ্কারে ত্রিভুবন কম্পিত হয় ॥২৩॥

ভূত পিসাচ নিকট নহিঁ আবৈ। মহাবীর জব নাম সুনাবৈ॥
মহাবীর হনুমানের নাম যখন যেখানে উচ্চারিত হয়, ভূত-পিশাচাদি সে স্থানের নিকটেও আসতে পারে না ॥২৪॥

নাসৈ রোগ হরৈ সব পীরা। জপত নিরন্তর হনুমত বীরা॥
নিরন্তর হনুমানের নাম জপ করলে সর্বপ্রকার রোগ-পীড়াদি বিনষ্ট হয় ॥২৫॥

Hanuman Chalisa in Bengali Pdf

সঙ্কট তেঁ হনুমান ছুড়াবৈ। মন ক্রম বচন ধ্যান জো লাবৈ।। যে মন, কর্ম ও বচনে শ্রীহনুমানের ধ্যান করে — মুখে তাঁর নাম কীর্তন, মনে তাঁর স্মরণ ও কর্মে তাঁর সেবা করে — তাকে তিনি সঙ্কট থেকে মুক্ত করেন॥ ২৬॥

সব পর রাম তপস্বী রাজা। তিন কে কাজ সকল তুম সাজা। তপস্বী শ্রীরাম সর্বজগতের সকলের প্রভু, সেই মহামহিমশালীর সকল গুরুতর কর্মসমূহের দায়িত্বপালন আপনার পক্ষেই সম্ভব হয়েছিল॥ ২৭ ॥

ঔর মনোরথ জো কোঈ লাবৈ। সোই অমিত জীবন ফল পাবৈ॥

(সুতরাং) অন্য যে কোনো মনোবাসনা নিয়ে যে আপনার দ্বারস্থ হয়, সে-ই অনন্ত জীবনের জন্য সেই সব ফললাভ করে (অর্থাৎ আপনার প্রদত্ত ফল সমূহ একজীবনে ভোগ করলেই শেষ হয়ে যায় না) ॥ ২৮ ॥

চারোঁ জুগ পরতাপ তুম্হারা। হৈ পরসিদ্ধ জগত উজিয়ারা॥
সর্বজগতেই একথা প্রসিদ্ধ আছে যে চার যুগেই আপনার প্রতাপ সমুজ্জ্বলভাবে বর্তমান॥ ২৯॥

সাধু-সন্ত কে তুম রখবারে। অসুর নিকন্দন রাম দুলারে॥
সাধু সজ্জনগণের আপনি রক্ষাকর্তা, অসুরদের বিনাশকারী এবং শ্রীরামচন্দ্রের একান্ত প্রিয়পাত্র ॥ ৩০॥

Hanuman Chalisa Bengali Pdf Download

অষ্ট সিদ্ধি নৌ নিধি কে দাতা। অস বর দীন জানকী মাতা॥
মাতা জানকীদেবী আপনাকে এইরূপ বর দিয়েছেন যে, আপনি ইচ্ছা করলেই অষ্ট সিদ্ধি এবং নয় প্রকার সম্পদ (নবধা ভক্তি অথবা কুবেরের পদ্ম, মহাপদ্ম প্রভৃতি নয়প্রকার নিধি) দান করতে পারেন॥ ৩১॥

রাম রসায়ন তুম্হরে পাসা। সদা রহো রঘুপতি কে দাসা॥
শ্রীরামের প্রতি প্রেম-ভক্তি আপনারই ভাণ্ডারে বিদ্যমান (অর্থাৎ আপনি দয়া না করলে তা লাভ করা যায় না)। আর আপনি সর্বদা রঘুপতির দাস হয়েই থাকেন ॥৩২॥

তুম্হরে ভজন রাম কো পাবৈ। জনম-জনম কে দুখ বিসরাবৈ॥
অন্তকাল রঘুবর পুর জাঈ। জহাঁ জন্ম হরি-ভক্ত কহাঈ॥

আপনার ভজনা করলে তা প্রকৃতপক্ষে শ্রীরামের উদ্দেশ্যেই নিবেদিত হয় এবং শ্রীরামের প্রীতি সম্পাদন করে। জন্ম-জন্ম সঞ্চিত দুঃখরাশিকে তা ভুলিয়ে দেয় (অর্থাৎ দুঃখ নির্মূল হয়ে যায়)। যেখানে ( যে দেশে বা বর্ণে অথবা জাতিতে) সেই ভজনাকারীর জন্ম হোক না কেন, ভগবদ্ভক্তরূপেই তাঁর পরিচিতি হয় এবং অন্তে তিনি শ্রীরামের নিত্যধামে গমন করেন ॥৩৩-৩৪॥

ঔর দেবতা চিত্ত ন ধরঈ। হনুমত সেই সর্ব সুখ করঈ। অপর কোনো দেবতার প্রতি চিত্ত নিবিষ্ট না করে কেবলমাত্র হনুমানের সেবা করলেই সর্ব ফললাভ হতে পারে॥৩৫॥

Hanuman Chalisa Pdf in Bengali

সঙ্কট কটৈ মিটৈ সব পীরা। জো সুমিরৈ হনুমত বলবীরা॥
যিনি মহাবলবীর্যসমন্বিত শ্রীহনুমানকে স্মরণ করেন, তাঁর সকল সঙ্কট দূরীভূত হয়, সর্ব রোগ নিরাময় হয়ে যায় ॥৩৬॥

জয় জয় জয় হনুমান গোসাঈঁ। কৃপা করহু গুরুদেব কী নাঈঁ॥
হে প্রভু হনুমানজী, আপনার জয় হোক, জয় হোক, জয় হোক। গুরুদেব যেমন তাঁর শিষ্যের প্রতি অনুগ্রহ প্রকাশ করে থাকেন, সেইরকম আপনিও আমাকে কৃপা করুন ॥৩৭॥

জো সত বার পাঠ কর কোঈ। ছূটহি বন্দি মহা সুখ হোঈ। এই হনুমান-চালীসা যে শতবার পাঠ করবে, তার বন্ধনমুক্তি ঘটবে এবং সে প্রভূত সুখ-সৌভাগ্য লাভ করবে ॥৩৮॥

জো য়হ পঢ়ৈ হনুমান চালীসা। হোয় সিদ্ধি সাখী গৌরীসা॥
যে কেউ এই হনুমান চালীসা পাঠ করবে, তারই সিদ্ধিলাভ (উদ্দিষ্ট ফললাভ) হবে, এ বিষয়ে স্বয়ং মহাদেব সাক্ষী ॥৩৯॥

তুলসীদাস সদা হরি চেরা। কীজৈ নাথ হৃদয় মহঁ ডেরা॥
তুলসীদাস সদা সর্বদাই শ্রীহরির সেবক, দাসানুদাস। হে প্রভু, আপনি তাঁর হৃদয়ে বাস করুন ॥৪০॥

দোঁহা

পবনতনয় সঙ্কট হরন, মঙ্গল মূরতি রূপ।
রাম লখন সীতা সহিত, হৃদয় বসহু সুর ভূপ॥

শ্রীরাম, লক্ষ্মণ এবং সীতাদেবী-সহ সঙ্কটমোচন, মঙ্গলময়বিগ্রহ সুরশ্রেষ্ঠ শ্রীপবননন্দন আমার হৃদয়ে বসতি করুন।
॥ ইতি ॥

সংকটমোচন হনুমানাষ্টক

মত্তগয়ন্দ ছন্দ

বাল সময় রবি ভক্ষি লিয়ো তব তীনহুঁ লোক ভয়ো অঁধিয়ারো।
তাহি সোঁ ত্রাস ভয়ো জগ কো য়হ সঙ্কট কাহু সোঁ জাত ন টারো॥
দেবন আনি করী বিনতী তব ছাঁড়ি দিয়ো রবি কষ্ট নিবারো।
কো নহিঁ জানত হৈ জগ মেঁ কপি সঙ্কটমোচন নাম তিহারো॥ ১ ॥

বালি কী ত্রাস কপীস বসৈ গিরি জাত মহাপ্রভু পন্থ নিহারো।
চৌঁকি মহামুনি সাপ দিয়ো তব চাহিয় কৌন বিচার বিচারো॥
কৈ দ্বিজ রূপ লিবায় মহাপ্রভু সো তুম দাস কে সোক নিবারো।
কো নহিঁ জানত হৈ জগ মেঁ কপি সঙ্কটমোচন নাম তিহারো॥ ২ ॥

অঙ্গদ কে সঁগ লেন গয়ে সিয় খোজ কপীস য়হ বৈন উচারো।
জীবত না বচিহৌ হম সো জু বিনা সুধি লাএ ইহাঁ পগু ধারো॥
হেরি থকে তট সিন্ধু সবৈ তব লায় সিয়া-সুধি প্রান উবারো।
কো নহিঁ জানত হৈ জগ মেঁ কপি সঙ্কটমোচন নাম তিহারো॥ ৩ ॥

রাবন ত্রাস দঈ সিয় কো সব রাক্ষসি সোঁ কহি সোক নিবারো।
তাহি সময় হনুমান মহাপ্রভু জায় মহা রজনীচর মারো॥
চাহত সীয় অসোক সোঁ আগি সু দৈ প্রভু মুদ্রিকা সোক নিবারো।
কো নহিঁ জানত হৈ জগ মেঁ কপি সঙ্কটমোচন নাম তিহারো॥ ৪ ॥

বান লগ্যো উর লছিমন কে তব প্রান তজে সুত রাবন মারো।
লৈ গৃহ বৈদ্য সুষেন সমেত তবৈ গিরি দ্রোন সু বীর উপারো॥
আনি সজীবন হাথ দঈ তব লছিমন কে তুম প্রান উবারো।
কো নহিঁ জানত হৈ জগ মেঁ কপি সঙ্কটমোচন নাম তিহারো॥ ৫ ॥

রাবন জুদ্ধ অজান কিয়ো তব নাগ কি ফাঁস সবৈ সির ডারো।
শ্রীরঘুনাথ সমেত সবৈ দল মোহ ভয়ো য়হ সঙ্কট ভারো॥
আনি খগেস তবৈ হনুমান জু বন্ধন কাটি সুত্রাস নিবারো।
কো নহিঁ জানত হৈ জগ মেঁ কপি সঙ্কটমোচন নাম তিহারো॥ ৬ ॥

বন্ধু সমেত জবৈ অহিরাবন লৈ রঘুনাথ পতাল সিধারো।
দেবিহিঁ পূজি ভলী বিধি সোঁ বলি দেউ সবৈ মিলি মন্ত্র বিচারো॥
জায় সহায় ভয়ো তব হী অহিরাবন সৈন্য সমেত সঁহারো।
কো নহিঁ জানত হৈ জগ মেঁ কপি সঙ্কটমোচন নাম তিহারো॥ ৭ ॥

কাজ কিয়ে বড় দেবন কে তুম বীর মহাপ্রভু দেখি বিচারো।
কৌন সো সঙ্কট মোর গরীব কো জো তুমসোঁ নহিঁ জাত হৈ টারো॥
বেগি হরো হনুমান মহাপ্রভু জো কছু সঙ্কট হোয় হমারো।
কো নহিঁ জানত হৈ জগ মেঁ কপি সঙ্কটমোচন নাম তিহারো॥ ৮ ॥

দোহা — লাল দেহ লালী লসে, অরু ধরি লাল লঁগূর।
বজ্র দেহ দানব দলন, জয় জয় জয় কপি সূর॥

॥ ইতি সংকটমোচন হনুমানাষ্টক সম্পূর্ণ ॥

শ্রীহনুমৎ-স্তবন

সোরঠা — প্রনবউঁ পবনকুমার খল বন পাবক গ্যানঘন।
জাসু হৃদয় আগার বসহিঁ রাম সর চাপ ধর॥

যিনি খল-রূপ বনের পক্ষে অগ্নিস্বরূপ, জ্ঞানের ঘনমূর্তি, যাঁর হৃদয়-মন্দিরে ধনুর্বাণধারী শ্রীরাম বাস করেন, সেই পবনকুমার হনুমানকে আমি প্রণাম করি।

অতুলিতবলধামং হেমশৈলাভদেহং
দনুজবনকৃশানুং জ্ঞানিনামগ্রগণ্যম্।
সকলগুণনিধানং বানরাণামধীশং
রঘুপতিপ্রিয়ভক্তং বাতজাতং নমামি॥

অতুলিত বলের আধার, স্বর্ণপর্বতের মতো উজ্জ্বল দেহ, দানবরূপ বনের পক্ষে অগ্নিস্বরূপ, জ্ঞানীদের অগ্রগণ্য, সকল গুণের নিধান, বানরদের অধীশ্বর, রঘুপতির প্রিয় ভক্ত পবনপুত্রকে আমি প্রণাম করি।

গোষ্পদীকৃতবারীশং মশকীকৃতরাক্ষসম্।
রামায়ণমহামালারত্নং বন্দেঽনিলাত্মজম্॥

যিনি সমুদ্রকে গোষ্পদের (গরুর খুরের চিহ্নের) মতো সহজে পার হয়েছেন, রাক্ষসদের মশার মতো তুচ্ছ করেছেন, রামায়ণরূপ মহামালার মধ্যে উজ্জ্বল রত্নস্বরূপ সেই পবনপুত্রকে আমি বন্দনা করি।

অঞ্জনানন্দনং বীরং জানকীশোকনাশনম্।
কপীশমক্ষহন্তারং বন্দে লঙ্কাভয়ঙ্করম্॥

মা অঞ্জনাকে যিনি আনন্দ দান করেন, জানকীর শোক যিনি নাশ করেছেন, সেই বীর, বানরপতি, অক্ষকুমারের সংহারক, লঙ্কায় ত্রাস সঞ্চারকারী শ্রীহনুমানকে আমি বন্দনা করি।

উল্লঙ্ঘ্য সিন্ধোঃ সলিলং সলীলং
যঃ শোকবহ্নিং জনকাত্মজায়াঃ।
আদায় তেনৈব দদাহ লঙ্কাং
নমামি তং প্রাঞ্জলিরাঞ্জনেয়ম্॥

যিনি লীলাভরে সমুদ্র লঙ্ঘন করে জনকাত্মজা সীতার শোকাগ্নি গ্রহণ করে তার দ্বারাই লঙ্কাকে ভস্মীভূত করেছেন, সেই অঞ্জনাপুত্রকে আমি করজোড়ে প্রণাম করি।

মনোজবং মারুততুল্যবেগং জিতেন্দ্রিয়ং বুদ্ধিমতাং বরিষ্ঠম্।
বাতাত্মজং বানরয়ূথমুখ্যং শ্রীরামদূতং শরণং প্রপদ্যে॥

মনের মতো দ্রুতগামী, বায়ুর সমান বেগশালী, জিতেন্দ্রিয়, বুদ্ধিমানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, বায়ুপুত্র, বানরসেনার প্রধান, শ্রীরামের দূত শ্রীহনুমানের আমি শরণ নিই।

আঞ্জনেয়মতিপাটলাননং কাঞ্চনাদ্রিকমনীয়বিগ্রহম্।
পারিজাততরুমূলবাসিনং ভাবয়ামি পবমাননন্দনম্॥

যাঁর মুখ অতিশয় রক্তবর্ণ, দেহ স্বর্ণগিরির মতো কান্তিময়, যিনি পারিজাত বৃক্ষের মূলে বাস করেন, সেই অঞ্জনানন্দন পবনপুত্রকে আমি ধ্যান করি।

যত্র যত্র রঘুনাথকীর্তনং তত্র তত্র কৃতমস্তকাঞ্জলিম্।
বাষ্পবারিপরিপূর্ণলোচনং মারুতিং নমত রাক্ষসান্তকম্॥

যেখানে যেখানে শ্রীরঘুনাথের (নাম, রূপ, গুণ, লীলা আদি) কীর্তন হয়, সেখানে সেখানে যিনি মাথায় করজোড় রেখে অশ্রুপূর্ণ নয়নে উপস্থিত থাকেন, রাক্ষসকুলের অন্তকারী সেই মারুতিকে সকলে প্রণাম করুন।

শ্রীহনুমানজীর আরতি

আরতি কীজৈ হনুমান ললা কী। দুষ্ট দলন রঘুনাথ কলা কী॥

জাকে বল সে গিরিবর কাঁপৈ। রোগ দোষ জাকে নিকট ন ঝাঁপৈ॥ ১
অঞ্জনি পুত্র মহা বলদাঈ। সন্তন কে প্রভু সদা সহাঈ॥ ২
দে বীরা রঘুনাথ পঠাএ। লঙ্কা জারি সীয় সুধি লাএ॥ ৩
লঙ্কা সো কোট সমুদ্র সী খাঈ। জাত পবনসুত বার ন লাঈ॥ ৪
লঙ্কা জারি অসুর সংহারে। সিয়ারামজী কে কাজ সঁবারে॥ ৫
লছিমন মূর্ছিত পড়ে সকারে। আনি সজীবন প্রান উবারে॥ ৬
পৈঠি পতাল তোরি জম-কারে। অহিরাবন কী ভুজা উখারে॥ ৭
বাএঁ ভুজা অসুর দল মারে। দাহিনে ভুজা সন্তজন তারে॥ ৮
সুর নর মুনি আরতী উতারেঁ। জয় জয় জয় হনুমান উচারেঁ॥ ৯
কঞ্চন থার কপূর লৌ ছাঈ। আরতি করত অঞ্জনা মাঈ॥ ১০
জো হনুমানজী কী আরতি গাবৈ। বসি বৈকুণ্ঠ পরমপদ পাবৈ॥ ১১

শ্রীরামবন্দনা

আপদামপহর্তারং দাতারং সর্বসম্পদাম্।
লোকাভিরামং শ্রীরামং ভূয়ো ভূয়ো নমাম্যহম্॥
রামায় রামভদ্রায় রামচন্দ্রায় বেধসে।
রঘুনাথায় নাথায় সীতায়াঃ পতয়ে নমঃ॥
নীলাম্বুজশ্যামলকোমলাঙ্গং সীতাসমারোপিতবামভাগম্।
পাণৌ মহাসায়কচারুচাপং নমামি রামং রঘুবংশনাথম্॥

শ্রীরামস্তুতি

শ্রীরামচন্দ্র কৃপালু ভজু মন হরণ ভবভয় দারুণং।
নবকঞ্জ-লোচন, কঞ্জ-মুখ, কর-কঞ্জ, পদ কঞ্জারুণং॥
কন্দর্প অগণিত অমিত ছবি, নবনীল-নীরদ সুন্দরং।
পট পীত মানহু তড়িত রুচি শুচি নৌমি জনক সুতাবরং॥
ভজু দীনবন্ধু দিনেশ দানব-দৈত্যবংশ-নিকন্দনং।
রঘুনন্দ আনঁদকন্দ কোশলচন্দ দশরথ-নন্দনং॥
সির মুকুট কুণ্ডল তিলক চারু উদারু অঙ্গ বিভূষণং।
আজানুভুজ শর-চাপ-ধর, সংগ্রাম-জিত-খরদূষণং॥
ইতি বদতি তুলসীদাস শঙ্কর-শেষ-মুনি-মন-রঞ্জনং।
মম হৃদয়-কঞ্জ নিবাস কুরু, কামাদি খলদল-গঞ্জনং॥

ছন্দ — মনু জাহি রাচেউ মিলিহি সো বরু সহজ সুন্দর সাঁবরো।
করুনা নিধান সুজান সীলু সনেহু জানত রাবরো॥
এহি ভাঁতি গৌরি অসীস সুনি সিয় সহিত হিয়ঁ হরষীঁ অলী।
তুলসী ভবানিহি পূজি পুনি পুনি মুদিত মন মন্দির চলী॥
সোরঠা — জানি গৌরি অনুকূল সিয় হিয় হরষু ন জাই কহি।
মঞ্জুল মঙ্গল মূল বাম অঙ্গ ফরকন লগে॥

॥ সিয়াবর রামচন্দ্র কী জয় ॥

শ্রীরামাবতার

ভএ প্রগট কৃপালা দীনদয়ালা কৌসল্যা হিতকারী।
হরষিত মহতারী মুনি মন হারী অদ্ভুত রূপ বিচারী॥
লোচন অভিরামা তনু ঘনস্যামা নিজ আয়ুধ ভুজ চারী।
ভূষন বনমালা নয়ন বিসালা সোভাসিন্ধু খরারী॥

কহ দুই কর জোরী অস্তুতি তোরী কেহি বিধি করৌঁ অনন্তা।
মায়া গুন গ্যানাতীত অমানা বেদ পুরান ভনন্তা॥
করুনা সুখ সাগর সব গুন আগর জেহি গাবহিঁ শ্রুতি সন্তা।
সো মম হিত লাগী জন অনুরাগী ভয়উ প্রগট শ্রীকন্তা॥

ব্রহ্মাণ্ড নিকায়া নির্মিত মায়া রোম রোম প্রতি বেদ কহৈ।
মম উর সো বাসী য়হ উপহাসী সুনত ধীর মতি থির ন রহৈ॥
উপজা জব গ্যানা প্রভু মুসুকানা চরিত বহুত বিধি কীন্হ চহৈ।
কহি কথা সুহাঈ মাতু বুঝাঈ জেহি প্রকার সুত প্রেম লহৈ॥

মাতা পুনি বোলী সো মতি ডোলী তজহু তাত য়হ রূপা।
কীজৈ সিসুলীলা অতি প্রিয়সীলা য়হ সুখ পরম অনূপা॥
সুনি বচন সুজানা রোদন ঠানা হোই বালক সুরভূপা।
য়হ চরিত জে গাবহিঁ হরিপদ পাবহিঁ তে ন পরহিঁ ভবকূপা॥

দোহা — বিপ্র ধেনু সুর সন্ত হিত লীন্হ মনুজ অবতার।
নিজ ইচ্ছা নির্মিত তনু মায়া গুন গো পার॥

শিবপঞ্চাক্ষরস্তোত্রম্

নাগেন্দ্রহারায় ত্রিলোচনায় ভস্মাঙ্গরাগায় মহেশ্বরায়।
নিত্যায় শুদ্ধায় দিগম্বরায় তস্মৈ নকারায় নমঃ শিবায়॥ ১ ॥

মন্দাকিনীসলিলচন্দনচর্চিতায় নন্দীশ্বরপ্রমথনাথমহেশ্বরায়।
মন্দারপুষ্পবহুপুষ্পসুপূজিতায় তস্মৈ মকারায় নমঃ শিবায়॥ ২ ॥

শিবায় গৌরীবদনাব্জবৃন্দসূর্যায় দক্ষাধ্বরনাশকায়।
শ্রীনীলকণ্ঠায় বৃষধ্বজায় তস্মৈ শিকারায় নমঃ শিবায়॥ ৩ ॥

বসিষ্ঠকুম্ভোদ্ভবগৌতমার্যমুনীন্দ্রদেবার্চিতশেখরায়।
চন্দ্রার্কবৈশ্বানরলোচনায় তস্মৈ বকারায় নমঃ শিবায়॥ ৪ ॥

যক্ষস্বরূপায় জটাধরায় পিনাকহস্তায় সনাতনায়।
দিব্যায় দেবায় দিগম্বরায় তস্মৈ যকারায় নমঃ শিবায়॥ ৫ ॥

পঞ্চাক্ষরমিদং পুণ্যং যঃ পঠেচ্ছিবসন্নিধৌ।
শিবলোকমবাপ্নোতি শিবেন সহ মোদতে॥

॥ ইতি ॥

হনুমান চালীসার মধ্যে এমন কিছু তথ্য আছে যা আপাত-বিরোধী, কিন্তু বাংলা ভাষায় এর বিস্তারিত ব্যাখ্যাসহ কোনো ভাল বই সম্ভবত না থাকায় এই লেখার দুঃসাধ্য প্রয়াস। একটা ছোট্ট উদাহরণ দিই। যেমন হনুমান চালীসায় আছে —

সঙ্কট তেঁ হনুমান ছুড়াবৈ।
মন ক্রম বচন ধ্যান জো লাবৈ॥ (হঃ চাঃ ২৬)

এখন প্রশ্ন হচ্ছে ‘মন’, ‘ক্রম’, ‘বচন’, ‘ধ্যান’, এগুলি এমন কোনো সহজসাধ্য বিষয় নয় যে ইচ্ছা করলেই তা করা যায়। মানসিক, বাচিক, কায়িক ও ধ্যান এগুলির বৈশিষ্ট্যই এমন যে এরা দীর্ঘ সময়ের সাধন সাপেক্ষ (মূলত জড় ও চঞ্চল মনকে স্থির করা)। তাহলে এমন কেন হয় যে হনুমান চালীসা ইচ্ছায় বা প্রথম প্রথম অনিচ্ছায় পাঠ করলে বা মন, ক্রম, বচন ও ধ্যান সঠিক না হলেও লোকে সঙ্কট থেকে উদ্ধার পাচ্ছে বা সঙ্কট কাটিয়ে উঠছে? আবার দেখুন এই চালীসাতেই আছে –

সঙ্কট কটৈ মিটৈ সব পীরা।
জো সুমিরৈ হনুমত বলবীরা॥ (হঃ চাঃ ৩৬)

অর্থাৎ শ্রীহনুমানজীর যে স্মরণ করে, তাঁর ভজনা করে বা পাঠ করে (তা সে শ্রীশ্রীরামচরিত মানস হোক বা শ্রীশ্রীরামচরিত মানসের ‘সুন্দর কাণ্ড’ হোক বা হনুমান চালীসা হোক, সঙ্কটমোচন হনুমানাষ্টক বা শ্রীহনুমৎ-স্তবন হোক ইত্যাদি) শ্রীহনুমানজী তার সঙ্কট কাটিয়ে দেন। লক্ষ্য করুন এখানে ‘সুমিরন’ অর্থাৎ স্মরণের কথা বলা হয়েছে, মন, ক্রম, বচন ও ধ্যান কিন্তু এবার বলা হয়নি। এখানেই শেষ নয়, এই হনুমান চালীসাতেই আরও আছে-

জো য়হ পঢ়ৈ হনুমান চালীসা।
হোয় সিদ্ধি সাখী গৌরীসা॥ (হঃ চাঃ ৩৯)

গৌরীসা অর্থাৎ গৌরীপতি স্বয়ং দেবাদিদেব মহাদেব। স্বয়ং মহাদেব সাক্ষী দাঁড়াচ্ছেন এই কথা বিশ্ববাসীকে জানাতে যে ‘হনুমান চালীসা’ যে পড়বে তার সিদ্ধির দায়িত্ব তাঁর। এখন ‘হনুমান চালীসা’ পাঠ, তা সে মানসিক, বাচিক, কায়িক হোক বা গুনগুন করে হোক, ভজন করে হোক বা সাধারণ পাঠের মতো করেই হোক, যেভাবে হোক করলেই তার মানসিক (মনই তো আসল) ইচ্ছাপূরণ হবে যার সাক্ষী স্বয়ং দেবাদিদেব মহাদেব হবেন।

কিন্তু প্রশ্ন ওঠে এই ‘হনুমান চালীসা’র এত প্রাধান্য এই কলিযুগে কেন ? কেন আমরা দেখি হনুমানজীর আরাধনা সমস্ত সাধু, সন্ত, যোগীরা করে থাকেন ? হনুমান চালীসা তাঁদের এত প্রিয় কেন ? যেহেতু হনুমান চালীসার পাঠ, তা সে বিশ্বাসেই হোক বা অবিশ্বাসেই হোক, মানুষকে তার মনের ইচ্ছা, বিশেষ করে সঙ্কট থেকে উদ্ধারে সাহায্য করছে, এই চালীসার প্রত্যেকটি শব্দ তাই মন্ত্র স্বরূপ এবং কোনো মন্ত্রই সঠিক অর্থবোধ ছাড়া বা উচ্চারণ ছাড়া তার পূর্ণফল দিতে অক্ষম হয়। আমার এই প্রচেষ্টা, যা কিনা গুরু ও শ্রীহনুমানজীর কৃপা সাপেক্ষ, তা শুধু এই চালীসার প্রকৃত অর্থ ব্যাখ্যাসহ প্রস্তুত করা যাতে হনুমান চালীসার পাঠ হয় সবদিক থেকেই পরিপূর্ণ ও পূর্ণফলদায়ী।

শ্রীহনুমান চালীসা যেহেতু গোস্বামী শ্রীতুলসীদাসজীর অনন্য গুরুস্মরণের মূল পৃষ্ঠভূমি, তাই বলা হয় যে ‘হনুমান চালীসা’ সমগ্র ‘শ্রীশ্রীরামচরিতমানস’-এর ভাষ্যস্বরূপ। আরও গভীরে গিয়ে বলা যায় শ্রীহনুমানজীর কাছে পৌঁছোনোর সবচেয়ে সহজতম সোপান হলো এই ‘হনুমান চালীসা’।

পরিশেষে অত্যন্ত জোরের সঙ্গে বলি যে এই চালীসার পাঠ শুধু সঙ্কটই দূর করে না, স্বয়ং শ্রীহনুমানজী নানানরূপে এসে তাদের সাক্ষাৎও দেন। লেখক এর সাক্ষী হওয়ার সৌভাগ্য ও কৃপা পেয়েছেন। তাইতো মুক্তকণ্ঠে বলি এ এমন এক দুর্লভ বস্তু (হনুমান চালীসা) যা অবিশ্বাসেও ফল দেয়। বাকীটুকু আপনাদের হাতে ছাড়লাম। দেবাদিদেব মহাদেব যার সাক্ষী তাঁর কি অন্যথা হতে পারে ? কলিযুগের সমস্যা-জর্জরিত ছুটে চলা মানুষের সঙ্কট সমাধানের এর চেয়ে ভালো কোনো সহজ বিকল্প বোধ হয় আর হতে পারে না।

জয় সীয়ারাম
জয় শ্রীগুরু
জয় শ্রীহনুমান

প্রাক্-কথন

শ্রীরামতত্ত্ব যেমন জানেন মাত্র তিনজন — ভগবান শংকর, মাতা ভবানী ও কাকভুশুণ্ডি — তেমনি শ্রীহনুমানতত্ত্বও আগাগোড়া রহস্যে ঘেরা। এই ব্রহ্মাণ্ড-চালন ব্যবস্থায় তার ভূমিকাও কোনো অংশে ত্রিদেবের চেয়ে কম নয়। সর্বব্যাপক ভগবান বিষ্ণুর সত্ত্বগুণের ধারক ও বাহক হিসেবে তিনি আরও অনেক কিছুর মধ্যে এই ভূলোকের সর্বত্র সর্বদা বিচরণ করছেন। তিনি স্বয়ং প্রাণতত্ত্ব। এই বিশ্বের তিনি প্রাণ। তিনি পবনদেবের পুত্র। যে কোনো প্রাণ-কেন্দ্রিক সাধনা তাঁর কৃপা বিনা অধরাই থেকে যায়। আর তাই

“সাধু-সন্ত কে তুম রখবারে। ……….” (হঃ চাঃ/৩০)

শ্রীহনুমানজী জাগ্রত তত্ত্ব। তিনি সদা জাগ্রত ও রামভজন রত। হরির সাধন-ভজন রত ব্যক্তির প্রতি তিনি অবশ্যই দৃষ্টি দেবেন এবং সেই ব্যক্তির উপলব্ধি অবশ্যই তাঁর কৃপা সাপেক্ষ।
আসুন, এইবার ‘হনুমান চালীসা’র কথায় চলে যাই।

এরকম মনে করা হয় যে এই ‘হনুমান চালীসা’র রচনা শুরু হয় অযোধ্যায়। প্রকৃতপক্ষে শ্রীশ্রীরামচরিতমানসের পুরো রচনাই গোস্বামী তুলসীদাসজী লেখেন অযোধ্যায় বসে; কিন্তু হনুমান চালীসা লিখতে লিখতে তিনি ‘কৈলাস-মানস সরোবরের’ উদ্দেশ্যে রওনা দেন বলে শোনা যায় এবং এই চালীসার শেষভাগ তিনি লেখেন মানস সরোবরের অতি মনোরম পরিবেশে। তিনি চালীসার চতুর্থ ও শেষ ভাগ ভগবান শংকরের পদমূলে বসে ও তাঁকে সাক্ষী রেখে শেষ করেন। গোস্বামীজী অত্যন্ত বিস্ময়ের সঙ্গে তাই শ্রীশ্রীহনুমান চালীসার শেষ কয়েক চরণে বলেন :

জো য়হ পঢ়ৈ হনুমান চালীসা।
হোয় সিদ্ধি সাখী গৌরীসা॥ (হঃ চাঃ/৩৯)

গৌরীসা অর্থাৎ গৌরীপতি দেবাদিদেব মহাদেব। এখন দেখার এই ‘পড়া’টা কেমন হবে? এই বিষয়ে আমরা পরে বিস্তারিত আলোচনা করব। প্রথমেই দেখে নেওয়া যাক, এই ‘হনুমান চালীসা’য় ‘চালীসা’ শব্দ কেন এলো? চল্লিশ পংক্তিই কেন? উনচল্লিশ কিংবা একচল্লিশ কেন নয়?

এখানে বলে রাখা ভাল গোস্বামী তুলসীদাসজী প্রধানত পরম্পরায় বিশ্বাস করতেন। স্মৃতি, শ্রুতি, বেদ, উপনিষদ, শাস্ত্রাদি ছিল তাঁর রচনার আধার। তাই ‘চালিসা’ নামের পিছনে এই শাস্ত্রাদির প্রভাব থাকা অমূলক নয়। মনে রাখা দরকার যে, এই চালীসার প্রবর্তন প্রথমে তিনিই করেন। তাঁর লেখার পরও চালীসা অনেক হয়েছে, যেমন বিভিন্ন দেব-দেবীর চালীসা, অধুনা নেতা-নেত্রীর চালীসা ইত্যাদি।

আর একটা জিনিস এখানে মনে রাখা দরকার যে গোস্বামীজী মূলত কাশীতেই থাকতেন এবং তাই তাঁর মনের মধ্যে সব সময়ে এই অনুভব ছিল যে, তিনি যাই লেখেন না কেন তার ব্যাখ্যা শাস্ত্রানুরূপ না হলে কাশীর পণ্ডিত কুলের অনুমোদন পাবে না। ইতিহাস বলে যে, গোস্বামীজী নিজের মতো থাকতেন এবং পণ্ডিত সমাজকে খুব একটা পাতা দিতেন না।

পূজ্য গোস্বামীজী যখন হনুমান চালীসা লেখা মনস্থ করেন তখন পরম্পরার ও কাশীবাসের কারণে প্রথমেই সর্ব-শাস্ত্রাদির মূল ‘বেদ’-এর ঐ মন্ত্রের কথা তাঁর মনে পড়ে, যেখান থেকে চল্লিশ বা চালীসার কথা মাথায় আসে। ‘বেদ’-এর সেই মন্ত্রটি এইরূপ :

যঃ শম্বরং পর্বতেষু ক্ষিয়ন্তং চত্বারিংশ্যাং শরদ্যন্ববিন্দৎ।
ওজায়মানং যো অহিং জঘান দানুং শয়ানং স জনাস ইন্দ্রঃ॥ (ঋগ্বেদ ২।১২।১১)

মন্ত্রটি বেদের সেই কাহিনীকে চিত্রিত করে, যে কাহিনী অনুসারে কোনো এক কালে শম্বর নামে এক রাক্ষস চতুর্দিক পর্বত পরিবেষ্টিত এক দুর্গম গুহায় বাস করতো। সমস্ত দেবতাদের, ঋষি-মুনিদের, সাধু-সজ্জনদের নানান রকম শারীরিক ও মানসিক পীড়া দিতো এবং চতুর্দিকে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থার সৃষ্টি করেছিল। সে ঐ গুহার ভিতর শুয়ে থাকত এবং যখনই বাইরে বেরোতো তখন চারিদিকে হাহাকার রব শোনা যেতো।

এই রাক্ষস ছিল অবধ্য। দেবতা ও মুনি-ঋষিদের আর্তি শুনে দেবরাজ ইন্দ্র তাকে বধ করার সঙ্কল্প নিয়ে তার খোঁজ শুরু করেন। তাঁর এই খোঁজ শুরু হয় ভাদ্র মাসের প্রথম দিনে এবং অনেক চেষ্টার পর আশ্বিন মাসের দশমীর দিন ইন্দ্র এই রাক্ষসকে বধ করেন। রাক্ষসকে খোঁজা ও গুহা থেকে বার করে তাকে বধ করতে ইন্দ্রের লাগে চল্লিশ দিন (ভাদ্রমাসের ত্রিশ দিন ও আশ্বিনমাসের দশ দিন)।

এই ভাবে সংসারকে ওই রাক্ষস থেকে পরিত্রাণ দিতে তাঁর লাগে চল্লিশ দিন। গোস্বামীজীর হঠাৎ বেদের ওই মন্ত্রের কথা মনে হবার কারণ হলো মনুষ্যজীবনে এরই উদাহরণ। আমাদের জীবনের মন-গুহায় না জানি কত শম্বর এইভাবে শুয়ে আছে যা আমাদের ইন্দ্রিয়গুলিকে (অন্তঃকরণ ও বহিঃকরণ) অহরহ উৎপীড়ন করছে যার কারণে আমাদের সমস্ত চিন্তা-ভাবনা ও কর্ম রজঃ-তমঃয় ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। শুভ চিন্তা, ভাল দেখা, ভাল বলা সব কেমন যেন মরীচিকার আকার নিচ্ছে। শুধু একজন্মে নয়, এই শম্বর শত শত জন্মে তার এই খেলা চালাচ্ছে। আমাদের না গুহার খবর আছে, না শম্বরের।

অথচ এই ইন্দ্রিয়গুলির অসীম ক্ষমতা আছে ওই শম্বরকে খুঁজে বার করে তার নিধন করার। এই ‘হনুমান চালীসা’ সেই ইন্দ্র যে শম্বরের অজান্তে তাকে টেনে বার করে বধ করার সামর্থ্য রাখে। এই চল্লিশ দিনের যাত্রা তাই তুলসীদাসজীর প্রথম মনে পড়লো। তাঁর চালীসার বিচারের শুরু এখান থেকে। তাঁর চালীসা লেখার প্রথম প্রেরণাও এখান থেকে। তাঁর মনে হলো শ্রীহনুমানজীর প্রকৃষ্ট সাধনা (তুলসীদাসজীর ভাষায় – সীধা-সাদা) এই হনুমান চালীসাকে সকলের সুবিধার জন্য চল্লিশ পংক্তিতে ধরে রাখি। পূজ্য গোস্বামীজীর দূরদৃষ্টিতে এই কথা ধরা পড়তে দেরি হয়নি যে, কলিযুগের মানুষের এই চল্লিশ পংক্তি পড়তে ধৈর্যের অভাব হবে।

বেদই শুধু নয়, চল্লিশ দিনের মাহাত্ম্য ইতিহাসের অনেক জায়গায় পাওয়া যায়। বিখ্যাত ‘টেন কম্যান্ডমেন্টস’ (Ten Commandments) মোজেস (হজরত মুসা) পেয়েছিলেন পাহাড়ের গুহায় চল্লিশ দিন কাটানোর পর। যীশু খ্রিস্ট মরুভূমিতে টানা চল্লিশ দিন উপবাসের কারণে ‘শয়তানি শক্তি’র উপর জয় পেয়েছিলেন। চল্লিশ দিনের মাহাত্ম্য পবিত্র ইসলাম ধর্মেও আছে।

পূজ্য গোস্বামীজীর মাথায় এইগুলিও যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিল বলে মনে হয়। গোস্বামীজী এই ‘চালীসা’ শব্দটি তাই অনেক চিন্তা-ভাবনার পর গ্রহণ করেছেন। উপরের দুটি কারণের প্রেরণা ছাড়াও অন্য কয়েকটি বিষয়ও তাঁকে প্রভাবিত করেছিল। মানব জীবনের যাবতীয় সঙ্কটের মূল কারণ তো নিহিত আছে তার নিজের অন্তঃকরণে আর তাঁর ‘হনুমান চালীসা’ লেখার মূল কারণই হলো মানুষকে সঙ্কট থেকে নিস্তার পাবার সহজ ও সুগম রাস্তা দেখানো। অন্তঃকরণের শুদ্ধিকরণ ছাড়া তা তো সম্ভবই নয়।

আমাদের অন্তঃকরণ মূলতঃ চারটি বস্তুর উপস্থিতি ও তাদের কার্য-কারণের ফল। এগুলি হল মন, বুদ্ধি, চিত্ত ও অহংকার। মনের আবার দশ লক্ষণ, বুদ্ধিরও দশ লক্ষণ, চিত্ত ও অহংকারের আবার দশ-দশ লক্ষণ। এর মধ্যে কিছু লক্ষণ ভাল ও কিছু লক্ষণ ক্ষতিকারক। এই চার বস্তুর দশ-দশ লক্ষণকে একত্র করলে হয় চল্লিশ। আর হনুমান চালীসা পাঠ এই চল্লিশ লক্ষণের মধ্যে যেগুলো শুভ তাকে আরও জোরালো বা বলিষ্ঠ করতে আর অশুভ লক্ষণগুলোকে নিস্তেজ বা স্তিমিত করতে প্রভূত সাহায্য করে। এখন দেখা যাক, এই লক্ষণগুলি কী কী? মন, বুদ্ধি, চিত্ত ও অহংকার যদিও সম্মিলিতভাবে আমাদের অন্তঃকরণ কিন্তু নিজের নিজের লক্ষণের কারণে এরা একদিকে যেমন স্বাধীন বা স্বতন্ত্র, অন্যদিকে এরা একজন আর একজনের পরিপূরক, শুভ-অশুভ দুই অবস্থাতেই।

আসুন আমরা এবার লক্ষণগুলিকে চিনে নিতে সংক্ষেপে একবার চোখ বুলিয়ে নিই। এদের শুভ-অশুভ প্রভাবটাও বোঝার চেষ্টা করি। চালীসার প্রভাব জানতে গেলে এদের জানাও জরুরি। প্রথমেই জেনে রাখা ভাল এই চার বৃত্তির সবটাই কিন্তু জড় অর্থাৎ চেতনরহিত। সৃষ্টিতত্ত্বের অংশ এরা এবং মায়াকবলিত।

মন :- সবার প্রথমে মনকেই ধরা যাক। মন সর্বদা চঞ্চল এবং তীব্র গতিশীল। সঙ্কল্প-বিকল্প এর মূল আধার। ঈর্ষা, দ্বেষ, স্পর্ধা মনের ক্ষতিকর দিকগুলির অন্যতম। অধ্যাত্ম মার্গের এরা প্রবল বাধা এবং এদের বাস মনের গভীরতম প্রদেশে। এদের চেয়েও ক্ষতিকর হচ্ছে ‘ভয়’ ও ‘সন্দেহ’ যা কিনা বিষয় ও ব্যক্তির প্রতি অতিরিক্ত প্রীতির কারণে হয়।

বুদ্ধি :- অন্তঃকরণের বৃত্তিগুলির মূল চালক হল বুদ্ধি। এর অন্যতম কাজ হল মনকে চালনা করা। কলিযুগে কিন্তু এর উল্টোটাই দেখা যায়। বুদ্ধির লক্ষণের অন্যতম হল বিষয়ে ‘নিশ্চয়তা’ দেওয়া। আবার ভুল বোঝাও এর কাজ। মজার কথা হল এই বুদ্ধিই আবার অন্যায়কে পরামর্শ দেয় এবং ছলচাতুরীর আশ্রয় নেয়।

এর ভাল দিকগুলির মধ্যে অন্যতম হল শাস্ত্র ইত্যাদিতে দক্ষতা পাবার ইচ্ছা বা জ্ঞানলাভের আকাঙ্ক্ষা। এর আর একটি বিশেষত্ব হল কখনও কারোর কুক্ষিগত না হওয়া কারণ সে সর্বদাই বিকশিত হওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে। সূর্য বুদ্ধির প্রিয় দেবতা আর তাই গায়ত্রী মন্ত্র এই বুদ্ধিকে “ধিয়ো যো নঃ প্রচোদয়াৎ” করার আহ্বান জানায়।

চিত্ত :- একে এককথায় ‘সংগ্রাহক’ বলা যায়। জন্ম-জন্মান্তরের সংস্কার এর ভাণ্ডারে জমা থাকে। একদিকে বিক্ষিপ্ত হওয়া যেমন এর কাজ, তেমনি এর অত্যন্ত ভাল দিক হল ‘দ্রবীভূত’ হওয়া যা আধ্যাত্মিক জীবনে খুবই জরুরি। প্রসন্নতা বা উদাসীনতা এর থেকেই আসে। মহর্ষি পতঞ্জলি আধ্যাত্ম মার্গের সাধনায় এই চিত্তের ওপর খুব জোর দিয়েছেন। তাঁর কথা অনুযায়ী ‘চিত্তবৃত্তি-নিরোধ’ মানুষকে ‘সমাধি’-স্থিতিতে পৌঁছে দিতে সক্ষম।

অহংকার :- এটি একটি তামসিক বৃত্তি। এর প্রভাবে মানুষ অভিমানী হয়। শত্রুতা বা হিংসা এর সহজাত। চাটুকারিতা এদের খুব পছন্দের হয়। প্রমাদের কারণে অপরকে তাচ্ছিল্য বা আঘাত করতে এদের বিন্দুমাত্র দ্বিধা থাকে না।

হনুমান চালীসা পাঠ এই লক্ষণগুলির অশুভশক্তিকে ধীরে ধীরে শেষ করে দেয় এবং তা হয় আমাদের অজান্তে। তখন এরাই সমস্ত শুভ গুণের আধার হয়ে ধীরে ধীরে মনকে অন্তর্মুখী করতে সাহায্য করে। এতক্ষণ আমরা অন্তঃকরণের মন, বুদ্ধি, চিত্ত ও অহংকারের লক্ষণগুলি সংক্ষেপে জানলাম। এর মধ্যে শুভ ও অশুভ দুইই আছে।

আগেই বলেছি শ্রীহনুমান চালীসা পাঠ শুভ লক্ষণগুলিকে প্রকাশ করে এবং তাকে বলবতী করে আর অশুভ লক্ষণগুলিকে তার মূল থেকে উচ্ছেদের কাজ করে। কিছু কথাকার তাঁদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা থেকে চালীসা নামের আরও কিছু কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। এক মত অনুযায়ী ‘চালীসা’র সন্ধি হলো : চাল্ + ঈশ্ অর্থাৎ চলমান ঈশ্বর। যে ঈশ্বর চলতে শেখায়, যে জীবিত, যে আমাদের জীবন-দর্শনের মূল প্রেরণা স্বরূপ, চালীসা তাঁরই গুণরাশির বর্ণনা।

আবার যাঁরা ভগবান শিবের পরম ভক্ত, তাঁরা যেহেতু হনুমানজী একাদশ রুদ্র অবতার, তাই ভগবান শিবের সঙ্গে এই চালীসার মিল খোঁজেন। অনুধাবনে কঠিন হলেও তাঁদের মতে ভগবান সদাশিবের দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ, অষ্টমূর্তি (বেদ ও মহিম্নঃ স্তোত্র অনুযায়ী), পঞ্চমুখ এবং পনেরো নেত্র মিলে চল্লিশ হয় এবং চালীসা নামের এটাও একটা কারণ। আসুন, আমরা এবার হনুমান চালীসার মূল পর্বে প্রবেশ করি।

দোঁহা

শ্রীগুরু চরন সরোজ রজ, নিজ মনু মুকুরু সুধারি।
বরনউঁ রঘুবর বিমল জসু, জো দায়কু ফল চারি॥

সারানুবাদ : শ্রীগুরুদেবের চরণ পদ্মের ধূলিতে নিজের মনরূপী আয়নাকে পরিষ্কার করে রঘুবংশের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির নির্মল কীর্তি বর্ণনা করছি যা কিনা চার রকমের ফল দিতে পারে।

ব্যাখ্যা :- হনুমান চালীসার এই দোঁহা দিয়ে যেমন চালীসা আরম্ভ হয়েছে, তেমনি এই দোঁহাই আবার শ্রীশ্রীরামচরিতমানসের অযোধ্যাকাণ্ডের প্রথম দোঁহারূপে বিরাজ করছে। অর্থাৎ সবার আগে গুরু-স্মরণ দিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছে। গুরু বন্দনা দিয়ে শুরু করা তো আমাদের পরম্পরায় আছেই। কিন্তু এখানে গুরুর আগে ‘শ্রী’ শব্দ ব্যবহার হয়েছে। ‘সদ্গুরু’ লেখা হয়নি, ধর্মগুরু নয়, বিদ্যাগুরু নয়, কুলগুরুও নয়, জগদ্গুরুও নয়।

গোস্বামী তুলসীদাসজী ভগবান শঙ্করের কৃপায় কবি হয়েছেন। গোস্বামীজী রামায়ণে সদ্গুরু শব্দ তো ব্যবহার করেছেন। কিন্তু হনুমান চালীসা ও অযোধ্যাকাণ্ডের আরম্ভই করেছেন ‘শ্রী’ শব্দ ব্যবহার করে। শাস্ত্রে এই ‘শ্রী’ শব্দের অনেক মাহাত্ম্য বর্ণনা রয়েছে। সাধারণত কোনো ভগবত কথা শুরু হয় “অথ শ্রী …….” বলে, বর্ণনা শেষ হয় “ইতি শ্রী ……” বলে।

এই ‘শ্রী’ ঐশ্বর্য সূচক, কল্যাণকারী বা মঙ্গলপ্রদ বলে এর এত প্রাধান্য। আবার ‘শ্রী’র আর এক অর্থ লক্ষ্মীও হয়। কিন্তু এই ‘শ্রী’ শব্দ লক্ষ্মীর চেয়েও উপরে থাকে যখন আমরা দেখি যে দেবী লক্ষ্মীর বিখ্যাত সূক্ত ‘লক্ষ্মীসূক্ত’ না হয়ে ‘শ্রীসূক্ত’ রূপে বিখ্যাত হয়। গোস্বামীজী গুরুর আগে শ্রী শব্দ ব্যবহার করে জগতকে জানাতে চাইছেন যে আমার গুরুও ঐশ্বর্যবান, লক্ষ্মীবান ও কল্যাণকারী। আমার গুরু সৃজনকারীও বটে।

প্রসঙ্গক্রমে, একটা কথা এখানে উঠে আসে যে পরম্পরায় গুরুর নাম তো সাধারণতঃ নেওয়া হয় না কারণ নাম নিলে গুরু ব্যক্তি হয়ে যান, তিনি আর ব্যাপক পরমতত্ত্ব থাকেন না। তুলসীদাসজীকে যখন একান্তভাবে গুরুর নাম নিতে হতো তখন তিনি কখনও কখনও ‘হরি’ শব্দ ব্যবহার করতেন। তিনি তাঁর ‘বিনয় পত্রিকায়’ ‘হে হরি’ শব্দ তাঁর গুরু স্মরণে বেশ কয়েকবার ব্যবহার করেছেন।

শুধু তাই নয়, এই হনুমান চালীসায় তিনি ‘হরি’ শব্দ ব্যবহার করেছেন একেবারে শেষ চৌপাঈ-এ “তুলসীদাস সদা হরি চেরা” (হঃ চাঃ — চৌ ৪০)। হনুমান চালীসার আরম্ভে তো আছেই, গুরুর স্মরণ চালীসার উপসংহারেও আছে। মঙ্গলাচরণে গুরুদেবকে স্মরণের পরে হনুমান চালীসার শেষেও গুরুকে স্মরণ করতে ভোলেননি। চৌপাঈ ৩৭-এ তিনি লিখছেন — ‘জয় জয় জয় হনুমান গোসাঈঁ। কৃপা করহু গুরুদেব কী নাঈঁ॥’

এর থেকে এটা স্পষ্ট যে তুলসীদাসজী শ্রীহনুমানজীকে গুরুর আসনে স্থাপন করেছেন। তাঁর উপাসনা করেছেন। এরপর এই গুরুর চরণকে পদ্মের সঙ্গে তুলনা করে তার ‘রজ’ বা ধূলির দ্বারা নিজের মন-দর্পণকে পরিষ্কার করার কথা বলছেন। ‘রজ’ মানে চরণ স্পর্শ করে তাঁর ধুলো নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ‘রজ’র ব্যাপক অর্থ শাস্ত্রকাররা করেছেন।

যেমন ‘রজ’ মানে গুরুর বচন, ‘রজ’ অর্থে গুরু যে মতাদর্শের অনুসরণ করেছেন সেই পথে চলার সাহস। গুরুর চরণের ‘রজ’ অর্থে মানুষের রজোগুণ মেটানোর ক্ষমতা রাখা। সমস্ত ভারতীয় শাস্ত্র গুরুর মহিমার বর্ণনায় কখনও ক্ষান্ত হয়নি। আসুন এবার দেখি এই মহিমার রহস্য : অধিকাংশ লোকের ধারণা যে গুরু তাঁর শিষ্যকে ভগবানের দর্শন করিয়ে দেন, তাই গুরুর এত মহিমা।

কিন্তু বেদান্ত এই তথ্যকে স্বীকার করে না। বেদান্ত শেখায় যে, বাস্তবে ভগবানকে তো মানুষ পেয়েই আছে কারণ মানব ও ভগবান অভিন্ন। এই ভগবানের সঙ্গে মানুষের পরিচয় করে দেবার কাজটি গুরু করেন, তাই তাঁর এত প্রাধান্য। শাস্ত্রকারেরা দু’রকম পুরুষার্থের বর্ণনা দিয়ে থাকেন।

যেমন-লৌকিক পুরুষার্থ :- আমার যা নেই তা অর্জন করার নাম লৌকিক পুরুষার্থ। মনে করুন কারুর বাংলো বাড়ি, গাড়ি ইত্যাদি নেই। সে যদি তার পরিশ্রম দ্বারা সম্পত্তি বানায় ও ক্রমে ক্রমে বাংলো বাড়ি, গাড়ি ইত্যাদি কেনে বা প্রাপ্ত হয়, তাকে বলে লৌকিক পুরুষার্থ।

অলৌকিক পুরুষার্থ :- আমার যা আছে, তার সম্বন্ধে আমাকে সম্যক জ্ঞান লাভ করার নাম অলৌকিক পুরুষার্থ। লৌকিক পুরুষার্থের দ্বারা সংসারের সব জিনিস উপলব্ধ হয় কিন্তু ভগবানকে পাওয়া যায় না, কারণ ভগবান তো আমার থেকে আলাদা নন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতার ১৮ অধ্যায়ের ৬১ নং শ্লোকে বলছেন —

“হে অর্জুন, ঈশ্বর প্রত্যেক প্রাণীর হৃদয়ে অবস্থান করছেন।” সমস্ত সৃষ্টিতে যুগ যুগ ধরে সনাতনী সদ্গুরুরা বার বার একটিই কথা বলেছেন যে, যে পরমতত্ত্বকে আপনারা বাইরে খুঁজে বেড়াচ্ছেন, তা বস্তুত আপনার ভিতরেই আছে। তুলসীদাসজী তাই যখনই শ্রীরামের স্মরণ করেন তখনই তিনি অশ্রুসজল নয়নে শ্রীহনুমানজীকে তাঁর সশ্রদ্ধ কৃতজ্ঞতা জানান। কারণ সদা অন্তরে অবস্থান করা প্রভুর খোঁজ তো হনুমানজীই দিয়েছিলেন একজন সমর্থ সদ্গুরু হিসেবে।

আপনারা কখনও ভেবে দেখেছেন যে, যে চোখ দিয়ে আমরা সমগ্র বিশ্বকে দেখছি, সেই চোখ দিয়ে আমরা নিজেকে দেখতে পারি না। নিজেকে দেখার জন্য চোখের তো দরকারই, সাথে দরকার একটি পরিষ্কার আয়না। তেমনি বিশুদ্ধ স্ব-স্বরূপকে না জানলে ঈশ্বরের অনুভবও অসম্ভব। বাইরের সংসার দেখার জন্য যেমন দুটি চোখ দরকার, তেমনি প্রভুদর্শনের জন্য ভেতরের দুটি চোখ দরকার – জ্ঞান এবং বৈরাগ্য। শরীরের দুই চোখে ছানি পড়লে আমরা যেমন সবকিছু ঝাপসা দেখি, তেমনি জ্ঞানরূপী অন্তশ্চক্ষুতে ‘দ্বেষ’ আর বৈরাগ্যরূপী অন্তশ্চক্ষুতে ‘রাগ’-এর ছানি পড়লে আমাদের অন্তর্দৃষ্টিও ঝাপসা হয়ে যায়। পরিণামে আত্মদর্শনও হয় না। চোখে ছানি পড়লে তা সারাবার জন্য যেমন ব্যবস্থা আছে, তেমনি এই জ্ঞান ও বৈরাগ্যের চোখের ছানি সারাবার অমোঘ ঔষধি হলো শ্রীগুরু চরণরজ অর্থাৎ সদ্গুরুর চরণরজ। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, যে ধূলিকণা উড়ে এসে চোখে পড়লে দৃষ্টি রুদ্ধ হয় এবং চোখ বন্ধ করতে বাধ্য হয়, সেই একই ধূলিকণা যদি গুরুর চরণে সম্বন্ধ পায়, তা হলে তা অন্তশ্চক্ষুর দৃষ্টি খুলে দেয় এবং স্বরূপের পরিচয় করায়।

শ্রীগুরু চরন সরোজ রজ, নিজ মনু মুকুরু সুধারি।
গুরুর চরণের ‘রজ’ নিয়ে বা মনরূপ আয়নাকে পরিষ্কার করার কথা আমরা জানলাম, কিন্তু গুরুর চরণকে পদ্মের সঙ্গে তুলনা কেন ?

তুলসীদাসজী বলছেন যে গুরুর চরণ ‘কমল’ স্বরূপ বা ‘পদ্ম’ স্বরূপ। পদ্ম কেমন, না যার রস আছে, রূপ আছে, গন্ধ আছে, স্পর্শ আছে, শব্দ আছে। যখন বাতাস বয়, তখন পদ্ম দুলতে থাকে আর বাতাসের সাথে মনে হয় যেন কথা বলে। শব্দ আসতে থাকে। পদ্মের রসও আছে। এই জগৎ পঞ্চ-তন্মাত্রে বিভোর হয়ে বিষয়ী হয়ে আছে (রূপ, রস, গন্ধ, শব্দ ও স্পর্শ)। কিন্তু গুরুর চরণকমল সর্বদাই শুভ। এই চরণকমলের রজ মানুষকে বিষয় থেকে দূরে নিয়ে জ্ঞান এবং বৈরাগ্যের সাথে পরিচয় করায় আর অন্তর্মনের চোখের ধুলো পরিষ্কার করে নিজেকে নিজের পরিচয় করায়।

বরনউঁ রঘুবর বিমল জসু : প্রশ্ন উঠতে পারে যে গোস্বামীজী যে শ্রীহনুমানজীর স্তুতি করার জন্য এই চালীসা রচনা করছেন, তাহলে প্রথম চরণেই কেন রঘুবর-এর বিমল কীর্তি বা রস বর্ণনার কথা বলছেন। আসুন এর কারণটা জেনে নিই :—

(১) সমগ্র শ্রীশ্রীরামচরিতমানসে, বিশেষতঃ সুন্দরকাণ্ডে মাতা সীতা ও ভগবান রাম শ্রীহনুমানজীকে ‘সুত’ অর্থাৎ পুত্ররূপে ডেকেছেন। শ্রীহনুমানজী তো জনকনন্দিনীকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করেছেন। সমগ্র রামায়ণে শ্রীরামচন্দ্রই শুধু নয়, পরন্তু রাজা দশরথ, লক্ষ্মণ, ভরত ও শত্রুঘ্নকেও রঘুবর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। রঘুকুলের যাঁরা শ্রেষ্ঠ তাঁদের সবাইকে রঘুবর আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

শ্রীহনুমানজী রঘুবর-এর দূত হিসেবেই শুধু নয়, রঘুবংশের সমস্ত কার্যে সেবক হিসেবে সর্বদা যোগদান করেছেন। শ্রীরাম ও জনকনন্দিনী সীতা তাঁকে পুত্ররূপে স্বীকার করেছেন। শ্রীহনুমানজী দেবী সীতাকে মা বলে সর্বদা সম্বোধন করেছেন। তাই তিনিও রঘুকুলের একজন শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হয়ে গেছেন। তিনিও তাই রঘুবর সম্বোধনে আছেন। এমনিতে বাড়ির কোনো সেবক দীর্ঘ দিন পরিবারের সাথে থাকলে, সে সেই পরিবারের একজন সদস্য হয়ে যায়।

(২) প্রভু শ্রীরামের কথা শ্রীহনুমানজীকে সদাই প্রসন্ন করে যেমন শ্রীহনুমানজীর গাথা প্রভু শ্রীরামকে। গোস্বামীজী খুব ভালভাবেই জানেন যে, শ্রীহনুমানজী তাঁর নিজের গুণ-গাথা শোনার জন্য কখনই আসবেন না। আর যাঁর গুণ-গাথা তিনিই যদি রস আস্বাদনের জন্য না আসেন তাহলে এই চালীসার রচনাও সর্বথা বৃথা প্রয়াস হবে। কিন্তু তিনি জানেন প্রভু শ্রীরামচন্দ্রের বিমল কীর্তির গাথা যেখানে হবে, সেখানে তিনি সত্বর পৌঁছে যাবেন। এর অনেক প্রমাণ আমরা শাস্ত্রে পেয়েছি। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের তাঁকে দ্বারকায় ডেকে আনার (মহামতি গরুড়কে দিয়ে) চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু যখন শ্রীকৃষ্ণ বলে পাঠালেন যে প্রভু শ্রীরাম তাঁকে দ্বারকায় স্মরণ করেছেন, তিনি তাঁর ধ্যান ভঙ্গ করে শ্রীগরুড়ের অনেক আগে দ্বারকায় পৌঁছেছিলেন এবং প্রভু শ্রীরাম ও মাতা সীতার দর্শনের আনন্দ নিয়েছিলেন। শ্রীশ্রীরামচরিতমানসে একটি ঘটনার উল্লেখ আছে যে সমুদ্রতীরে যখন মহামতি জাম্ববান বানর যোদ্ধাদের সাথে (এর মধ্যে বালীপুত্র অঙ্গদ, শ্রীহনুমানজী, নল, নীল ইত্যাদিও আছেন)

সমুদ্র পার হওয়ার প্রসঙ্গে পরিকল্পনা করছেন, তখন হনুমানজীর গুণকীর্তন করে তাঁকে সমুদ্র পার হতে বলেছিলেন। কিন্তু শ্রীহনুমানজীর কোনো উৎসাহ দেখা যায়নি কিন্তু যখন জাম্ববান তাঁকে বললেন যে, প্রভু শ্রীরামের এই কাজ আপনাকে করতে হবে এবং একমাত্র আপনিই প্রভুর ইচ্ছা পূরণ করতে সমর্থ, এই কথা শোনা মাত্র তিনি দাঁড়িয়ে পড়লেন এবং দেখতে দেখতে তাঁর বিশাল চেহারা ও কান্তিতে সবার চোখ ধাঁধিয়ে গেলো। তিনি একলাফে নিকটবর্তী পাহাড়ে উঠে পড়লেন সমুদ্র পার হবার জন্য।

জো দায়কু ফল চারি : তুলসীদাসজী চালীসার প্রথমে বলছেন যে, রঘুবীরের যশোগান করতে যাচ্ছি যা চার রকমের ফল দেয়। সাধারণতঃ ফলের বর্ণনা যে কোনো স্তোত্র বা স্তুতির শেষে হয় কিন্তু এখানে মঙ্গলাচরণের প্রথম দোহাতেই ফলের বর্ণনা দেখা যাচ্ছে। ভগবানের স্তুতি বা সেবা যোগ্য সময়ে তার ফল প্রদান করে, কিন্তু ভগবানের ভক্তের স্তুতি বা সেবা সঙ্গে সঙ্গে ফল প্রদান করার ক্ষমতা রাখে। শ্রীশ্রীরামচরিতমানসের উত্তরকাণ্ডের দোঁহা ১২০তে ভক্তপ্রবর কাকভুশুণ্ডিজী খগরাজ গরুড়কে বলছেন :-

‘মোরেঁ মন প্রভু অস বিস্বাসা। রাম তে অধিক রাম কর দাসা॥’
অর্থাৎ হে প্রভু, আমার মনে তো এই বিশ্বাস আছে যে প্রভু শ্রীরামের দাস প্রভু শ্রীরামের চেয়েও বড়।

শ্রীমদ্ভাগবত মহাপুরাণে (৯-৪-৬৩) ভক্তরাজ অম্বরীষকে রক্ষা করার সময় ভগবান ঋষি দুর্বাসাকে পরিষ্কার বলেছিলেন, “হে মহামুনি দুর্বাসা, আমি সদাই ভক্তাধীন থাকি, আমি একদমই স্বতন্ত্র নই। ভক্তরা আমার হৃদয় জিতে নেয়। ভক্তরা আমায় প্রেম করে আর আমি তাদের।”

তাই তুলসীদাসজী বলছেন যে, রঘুবরের যশগান যিনি করবেন, বিশেষতঃ তাঁর পরমভক্ত হনুমানজীর, তিনি অবশ্যই চার রকমের ফল পাবেন। অনেকটা এই রকম যেমন, যখন বর্ষা আসে তখন গাঁয়ের নদী জলে ভর্তি হয়। এখন তুমি জল ঘড়ায় ভরবে, না লোটায় নেবে, না খালি স্নান করবে এটা তোমার ওপর নির্ভর করবে। পরমাত্মার বা তাঁর ভক্তের গুণগানের বর্ষা অবশ্যই চার রকমের ফল দেবে।

এখন এটা নেওয়া না নেওয়া তোমার ওপর। চার রকমের যে ফল পাওয়া যাবে তা হলো : অর্থ, ধর্ম, কাম ও মোক্ষ। অর্থ বলতে আমরা যে টাকা-পয়সা বুঝি, স্থূল হিসেবে তা তো মিলবেই কিন্তু এর সাথে যেটা পাওয়া যাবে তা হলো অমূল্য অর্থাৎ জীবনের অর্থ। শাস্ত্র তথা জীবনের অর্থ তার কাছে ধীরে ধীরে পরিষ্কার হবে যার পিছন পিছন আসবে জ্ঞান ও বৈরাগ্য। আর অর্থ যদি ধর্মের রাস্তায় অর্জিত হয় তাহলে ধার্মিক হওয়া তো শুধু সময়ের ব্যাপার। কিন্তু ধার্মিক হওয়াই শেষ কথা নয়। বরং আধ্যাত্মিক পথের এটাই তো প্রথম সোপান।

ধর্মের পথ ধরে যে কর্ম অর্থ যোগায়, সেই কর্ম তখন আনন্দদায়ক হয়। অর্থ (টাকা-পয়সা) আছে, কিন্তু অর্থ যেন আমায় বাঁধতে না পারে; ধার্মিক আমি, কিন্তু যেন ধর্মান্ধ না হই; আমার কৃতকর্ম যেন অপরের সুখের কারণ হয়, কর্মে আমি যেন অনাসক্ত হই — আর তখনই মোক্ষ দোরগোড়ায় এসে হাজির হয়।

কিন্তু আধ্যাত্মিক মার্গের সত্যিকারের অনুরাগীরা এই চার পদার্থে বা ফলে সন্তুষ্ট নন। তাঁরা এই পাওয়াকে লোকসান বলে মনে করেন। হনুমান চালীসা পাঠ করে, রঘুবরের গুণকীর্তন করে, নাম-সংকীর্তন করে এই চার পদার্থ পাওয়াতে তাঁরা সন্তুষ্ট নন। তাঁরা বরং প্রভুর কাছে প্রার্থনা করেন যে, হে প্রভু, তুমি এই চার ফল ফেরত নাও এবং তার পরিবর্তে এক ফল দাও।

প্রভু তো অন্তর্যামী, তিনি মুচকি হেসে যদি জিজ্ঞেস করেন, এই চারের বদলে কি চাই? তখন প্রকৃত ভক্ত প্রভুকে বলেন যে, প্রভু, আপনার গুণগান করেছি তো চার ফল পেয়েছি, কিন্তু এই চার আপনি নিয়ে নিন আর পরিবর্তে আপনার চরণে অখণ্ড প্রেম দিন। গোস্বামীজী তাঁর লেখা বিনয় পত্রিকায় বলেছেন যে এই চার ফলের যদি কোনো ফল হয়, তবে তা হলো নাম। প্রভুর নামে প্রীতি। সংক্ষিপ্ত কথায় প্রভুপ্রেম।

দোঁহা

বুদ্ধিহীন তনু জানিকে, সুমিরৌঁ পবন-কুমার।
বল বুধি বিদ্যা দেহু মোহিঁ, হরহু কলেস বিকার॥

সারানুবাদ : নিজেকে বুদ্ধিহীন জেনে পবনকুমারকে স্মরণ করছি। প্রার্থনা করছি, আমাকে বল, বুদ্ধি, বিদ্যা দিন আর আমার ক্লেশ এবং বিকার হরণ করুন।

ব্যাখ্যা : অত্যন্ত সোজা সাপটা অর্থ। এই দোহায় ‘রামচরিতমানস’-এর মতো অনন্য গ্রন্থের প্রণেতা গোস্বামীজী বলছেন, “আমি আপনার কাছে প্রার্থী হয়ে এসেছি। আমি অজ্ঞানী, বুদ্ধিহীন, তাই হে পবনকুমার, আপনাকে স্মরণ করছি আর প্রার্থনা করছি যে, আপনি আমায় তিনটি জিনিস দিন- বল (শক্তি), বুদ্ধি ও বিদ্যা।” শ্রীহনুমানজী জিজ্ঞেস করছেন, “প্রথম দোহায় তো চার ফল পাওয়ার কথা হলো, কই তখন তো আপনি কিছু দাবি রাখেননি; তবে এখন কেন বল, বুদ্ধি ও বিদ্যা চাইছেন?” গোস্বামীজী তার উত্তরে বলছেন, “তিন বস্তু চাইছি এটা সত্য, কিন্তু পরিবর্তে সতেরো বস্তু আপনি নিয়ে নিন।”

বলছেন, “বল বুধি বিদ্যা দেহু মোহিঁ, হরহু কলেস বিকার।” সতেরো বস্তু আপনাকে দিচ্ছি আর কেবল তিনটি জিনিস আমাকে দিন। তুলনায় আমি দিচ্ছি অনেক বেশি, চাইছি খুব কম।” হনুমানজী তখন বলছেন, “আপনি আমায় স্মরণ করেছেন আর এই স্মরণ করেছেন অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে, অত্যন্ত দীনতার সঙ্গে; আপনার এই “আমি বুদ্ধিহীন” স্বীকার আমার মন ছুঁয়ে গেছে। এখন বলুন আপনি ঠিক কি চাইছেন আর সতেরো বস্তু ছেড়ে দেবার কথা কি বলছেন?”

গোস্বামীজী বলছেন, “সবার প্রথমে আপনি বল বা শক্তি দিন কারণ আমি শুনেছি আপনি অতুলিত বল ধাম।” এখানে লক্ষ করার বিষয় হলো যে গোস্বামীজী এই দোঁহায় শ্রীহনুমানজীকে পবনপুত্র বা বায়ুপুত্র বলে সম্বোধন করেছেন। দেবাদিদেব মহাদেবের দিব্যতেজ শ্রীহনুমানজীর মাতা অঞ্জনাতে প্রতিস্থাপিত করার মাধ্যম ছিলেন বায়ুদেব। তাই শ্রীহনুমানজীকে পবনপুত্র নামেও ডাকা হয়। তিনি তাঁর পিতা বায়ুদেবের কাছ থেকে মুখ্যতঃ তিনটি গুণ পেয়েছেন।

প্রথম : বল বা শক্তি, দ্বিতীয় :- প্রাণরক্ষকতা, তৃতীয় : সর্বব্যাপকত্ব। আগেই জানানো হয়েছে যে শ্রীহনুমানজী স্বয়ং প্রাণতত্ত্ব। বায়ুকে ছাড়া জীবন সম্ভব নয়। প্রাণের মূলই হল বায়ু। শ্রীহনুমানজী অনেক ব্যক্তির প্রাণ রক্ষা করেছেন।

যেমন, সুগ্রীব :- বালীর ভয়ে আতঙ্কিত সুগ্রীবকে প্রভু শ্রীরামের সঙ্গে বন্ধুত্ব করিয়ে তার প্রাণ রক্ষা করেছিলেন। পরম শক্তিমান বালিকে যদি প্রভু বধ না করতেন, তবে সুগ্রীবের বাঁচাই মুশকিল হতো।

যেমন, সীতা :- লঙ্কার অশোকবনে জনকনন্দিনী প্রাণত্যাগের জন্য মনস্থির করে ফেলেছিলেন। এই শ্রীহনুমানজীই সমুদ্র লঙ্ঘন করে সমগ্র লঙ্কায় খোঁজ করে অশোকবনে পৌঁছে প্রভু শ্রীরামের দেওয়া আংটি দিয়ে তাঁকে আশ্বস্ত করলেন যে, প্রভু শ্রীরাম একমাসের মধ্যে এসে তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন। এইভাবে উনি মা সীতার প্রাণরক্ষা করলেন।

লক্ষ্মণ : রাম-রাবণ যুদ্ধে মেঘনাদের বাণে মূর্ছিত লক্ষ্মণকে একরাত্রির মধ্যে হিমালয় থেকে সঞ্জীবনী বুটি এনে তাঁর প্রাণ রক্ষা করেছিলেন।

বায়ুর মতো শ্রীহনুমানজীও সর্বব্যাপী। এই সৃষ্টির যে কোনো স্থানে যে কোনো সময় প্রকট হয়ে তাঁর উপস্থিতির অনুভব তিনি করাতে পারেন। শ্রীহনুমানজীর ব্যাপকত্ব সীমাহীন। আমরা জানি যে বায়ু পাঁচ প্রকার। মানুষের দেহে অবস্থিত পঞ্চপ্রাণ যথা প্রাণ, অপান, ব্যান, উদান ও সমান-এর সঞ্চালক হলেন শ্রীহনুমানজী। এই পঞ্চপ্রাণের শরীরের অবস্থান এবং পঞ্চমুখী হনুমানজীর মুখের দিশা পরস্পর নিবিড়ভাবে সম্বন্ধযুক্ত। যেমন-

ক্রম প্রাণের প্রকার মনুষ্যদেহে স্থান শ্রীহনুমানজীর মুখ মুখের দিক/দিশা
১ প্রাণ হৃদয় কপি পূর্ব
২ অপান গুহ্যদেশ বরাহ উত্তর
৩ সমান নাভি নৃসিংহ দক্ষিণ
৪ উদান কণ্ঠ হয়গ্রীব ঊর্ধ্ব
৫ ব্যান সমগ্র শরীর গরুড় পশ্চিম

বলা হয় যে, গোস্বামীজী এই কারণে শ্রীহনুমানজীর চালীসায় পাঁচবার ‘জয়’ শব্দ প্রয়োগ করেছেন। কোথায় কোথায়-

জয় হনুমান জ্ঞান গুন সাগর। জয় কপীস তিহুঁ লোক উজাগর॥ (চৌপাঈ ১) জয় জয় জয় হনুমান গোসাঈঁ। কৃপা করহু গুরুদেব কী নাঈ।। (চৌপাঈ ৩৭)

বল বুধি বিদ্যা দেহু মোহিঁ :- গোস্বামীজী প্রথমেই শক্তি বা বল চাইলেন। এই চাওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি মানুষকে শেখালেন যে, হনুমানজীর কাছে যদি চাইতেই হয় তবে টাকা, পয়সা না চেয়ে শক্তি চান, কেননা আত্মা বলহীনে মেলে না। ‘মুণ্ডক উপনিষদ’ (‘নায়মাত্মা বলহীনেন লভ্যঃ’) এ কথা ঘোষণা করেছে যে, এই আত্মা বলহীন শরীরকে প্রাপ্ত হয় না। এখানে বল-এর অর্থ পালোয়ানি নয়; একজন সাধকের শারীরিক দিক দিয়ে সুস্থ থাকা জরুরি কারণ সুস্থ শরীরে মনও বলবান হয়।

কিন্তু শাস্ত্রকারগণ ও মুনি-ঋষিরা এর আরও অনেক গভীর অর্থ খুঁজে বার করেছেন যা প্রাসঙ্গিক মনে হওয়ায় সংক্ষিপ্ত ভাবে উল্লেখ করছি। যেমন সাধুর বল হলো সাধুতা। যাঁরা যোগী তাঁদের বল হলো যম-নিয়ম। এক আদর্শ নারীর বল হলো লজ্জা। বুদ্ধিমান-এর বল হলো তেজস্বিতা আর বিচারের শুদ্ধতা। ভক্তের বল হলো ভরসা। জ্ঞানীর বল হলো সমদর্শন বা সম্যক দর্শন।

ত্যাগীর বল হলো অন্তঃকরণে বৈরাগ্য। এখন বোঝা যাচ্ছে গোস্বামীজী কেন প্রথমেই বল চাইলেন কারণ তিনি বৈরাগী, যোগী, আবার জ্ঞানীও। তিনি ভক্ত, তিনি সদ্গুরু, তিনি সন্ত। গোস্বামীজী স্বয়ং বিশ্বাস আর শ্রদ্ধার ঘনীভূত রূপ।

শ্রীহনুমানজী তাঁর এই প্রার্থনা স্বীকার করে বলছেন, “ঠিক হ্যায়, বল দিয়া” (ঠিক আছে, তোমায় কাঙ্ক্ষিত শক্তি দিলাম)। তুলসীদাসজী তখন বললেন, “আমায় আর একটি বস্তু দিন। আপনি বুদ্ধিমান, তাই বুদ্ধি দিন।” শ্রীহনুমানজী তখন জিজ্ঞেস করলেন, “বল চেয়েছো, দিয়েছি। আবার বুদ্ধি চাইছ কেন ?”

তুলসীদাসজীর উত্তর মনকে ছুঁয়ে যাবার মতো। তিনি বলছেন, “আমি বুদ্ধি চাইছি কারণ বুদ্ধি শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ না করলে তা কখনও সৃজনশীল হয় না। আমি সমাজকে সৃজন করার জন্য যে বল, বুদ্ধি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত তাকে চাই।” বুদ্ধির কয়েকটি লক্ষণ আছে –

  • সমস্যা সমাধানের শক্তি;
  • বিপরীত অবস্থাকে অনুকূলে আনার শক্তি;
  • নির্ণায়ক শক্তি;
  • দূরদর্শিতা।

যদি শক্তি থাকে অথচ বুদ্ধি না থাকে পরিণামে হিংসা বাড়বে। তুলসীদাসজী সমগ্র মানব সমাজকে মাথায় রেখে ভেবেচিন্তে তাঁর প্রার্থনা রাখছেন।

কিন্তু এরপর বিদ্যা চাইলেন কেন ? কারণ শক্তি ও বুদ্ধি একত্রে মানুষকে উদ্ধত করতে পারে। এই দুই একত্রে বন্ধনেরও কারণ হয়। শাস্ত্রজ্ঞান আর অনুভব মানুষকে বিচারশীল করে। বিদ্যাবান মানুষ তার নম্রতা ও নিঃস্পৃহতার কারণে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। গোস্বামীজী শ্রীহনুমানজীর ভক্তদের জন্য এই সব প্রার্থনা করেছেন যাতে তাঁরা সদাই সদ্গুণের অধিকারী হন।

হরহু কলেস বিকার :- শ্রীহনুমানজী গোস্বামীজীর প্রার্থনা শুনে তাঁকে একে একে বল, বুদ্ধি ও বিদ্যা প্রদান করলেন। তারপর বললেন, “গোস্বামীজী আপনি বলছিলেন, যে সতেরো বস্তু আমায় দেবেন, তা দিন।” গোস্বামীজী বললেন, “এই সতেরো বস্তু এত গভীর ভাবে আমার মধ্যে ঢুকে গেছে যে আমি তো দিতে পারবো না, আপনি বরং তা ছিনিয়ে নিন।” বললেন, “হরহু কলেস বিকার।”

ঋষি পতঞ্জলি তাঁর যোগসূত্রে পাঁচ রকমের ক্লেশ-এর কথা বলেছেন। সেগুলো হলো অবিদ্যা-অস্মিতা-রাগ-দ্বেষ ও অভিনিবেশ। এই প্রতিটি বিষয় অত্যন্ত গভীর ও প্রভাবশালী। এ এক বিস্তৃত আলোচনার ক্ষেত্র। কিন্তু অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ভাবে বলতে গেলে বলতে হয় :-

১. অবিদ্যা :- পবিত্রতে অপবিত্রের ভাব দেখা আর অপবিত্রতে পবিত্রের ভাব দেখা; অনাত্মায় আত্মার আর আত্মায় অনাত্মার ভাব দেখা; বস্তুর প্রকৃতরূপকে না বুঝতে পারা, অসাধুতাতে সাধুতাকে দেখা বা সাধুতাতে অসাধুতাকে দেখা।

২. অস্মিতা :- একটা উদাহরণে যেমন তুলসীদাসজী বলছেন, আমি ব্রাহ্মণের ছেলে, আমি রামচরিতমানস লিখেছি, আমি বড় সাধু-সন্ত, আমার প্রভু রামের দর্শন হয়েছে, এ সমস্ত কিছু আমার মনকে যদি প্রভাবিত করে তো আপনি সেই অস্মিতা হরণ করুন। যেমন অস্মিতার কারণে মানুষ নিজেকে ইন্দ্রিয়, মন আর বুদ্ধির দাস ভাবে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে জীবাত্মা বা আমি এই সবের সঙ্গে সম্পর্ক রহিত।

৩. রাগ :- ইন্দ্রিয়, মন আর শরীরে আত্মভাব জাগ্রত হলে যে বস্তু, ব্যক্তি বা বিষয়ে সুখ অনুভব হয় বা তাঁকে পাওয়ার ইচ্ছা জাগে তাকে রাগ বলে। যতক্ষণ ঈপ্সিত বস্তুর প্রাপ্তি না হয় ততক্ষণ দুঃখের অনুভব হয়।

৪. দ্বেষ :- ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুর অপ্রাপ্তিতে যে দুঃখ অনুভব হয় সেই দুঃখের কারণগুলির প্রতি তখন দ্বেষ জন্মে, তা সে বস্তু হোক বা ব্যক্তি। তখন ঘৃণা, তিরস্কার বা ক্রোধের আকারে সেই দ্বেষের বহিঃপ্রকাশ হয়।

এই রাগ ও দ্বেষ দুটি কঠিন রোগ এবং এই রোগ সারানো খুব মুশকিল। কিন্তু জ্ঞান ও গুণের সাগর শ্রীহনুমানজীর কৃপায় যখন মানুষের নিজ শুদ্ধ-স্বরূপের জ্ঞান হয় তখন সে বোঝে যে আসলে এই সুখ আর দুঃখের আগমন তার নিজ আত্ম-স্বরূপের সঙ্গে সম্পর্কহীন। শ্রীহনুমানজীর কৃপায় তার তখন রাগ ও দ্বেষজনিত কারণকে অনিত্য মনে হয় এবং বৈরাগ্যভাবের অনুভবে এই দুটি সম্পর্কে উদাসীন হয়ে ওঠে।

৫. অভিনিবেশ :- মৃত্যুভয়ের আর এক নাম অভিনিবেশ। মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া কঠিন। মৃত্যুভয় কেন লাগে —

  • পুরনো কর্মের কথা মনে পড়ায়,
  • ভবিষ্যতের চিন্তা — এই সবের কি হবে ?
  • এতদিনের এই প্রিয় শরীর যাকে অত্যন্ত যত্নে লালন-পালন করা হয়েছে, তাকে ছেড়ে যেতে হবে — তার ভয়,
  • মৃত্যুযন্ত্রণার ভয়।

শ্রীহনুমানজীর কৃপায় যখন সাত্ত্বিক বুদ্ধির উদয় হবে, তখন দেহের নশ্বরতা ও আত্মার অমরত্বের জ্ঞান হবে এবং ধীরে ধীরে মৃত্যু ভয় চলে যাবে।

বিকার :- সর্বমোট বারো রকমের বিকার আছে। ছয় রকমের বিকার শরীরের, আর ছয় রকম বিকার মনের।

শরীরের বিকার :- অস্তি (গর্ভে অস্তিত্ব), জন্ম, বৃদ্ধি, পরিবর্তন, ক্ষয় ও মৃত্যু। তুলসীদাসজী প্রার্থনা করছেন এই ছয় বিকার হরণ করুন। আমার জন্ম, বৃদ্ধি, পরিবর্তন, ক্ষয় ও মৃত্যুকে হরণ করুন।

শরীরের পর মনের ছয় বিকার :- কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য। এই বিষয়ে আমাদের সবারই কিছু কিছু ধারণা আছে। অত্যন্ত সংক্ষেপে বলতে গেলে :

১. কাম :- সঙ্গ থেকে কাম-এর জন্ম। আসক্তি কাম বাড়ায়। ভগবান কপিল তাঁর মা দেবহুতিকে বলেছিলেন, সর্বদা সাধুসঙ্গ করা বা কখনই অসাধু সঙ্গ না করা কাম নাশের উপায়। সাধু তিনিই হবেন যিনি আসক্তিকে জয় করেছেন। কাম এক ধরনের মানসিক বিকার।

  • ক্রোধ :- কামনার বাধা হলেই ক্রোধ।
  • লোভ :- ‘লাভ’ এর ইচ্ছাই হল লোভ। বেশি লাভের ইচ্ছার কথাই বলা হচ্ছে।
  • মোহ :- সমস্ত মানসিক রোগের মূলই হলো মোহ।
  • মদ :- প্রাপ্ত বস্তু, ব্যক্তি বা বিশেষ কারণের জন্য গর্ব অনুভব করা।
  • মাৎসর্য :- অপরের ভাল উন্নতি দেখলে মনের জ্বলনকে বলে মাৎসর্য।

শ্রীহনুমান চালীসা নিয়মিত পাঠ করা এক ভক্ত শ্রীহনুমানজীর কাছে তাঁর আর্তি এইভাবে রাখছেন যা অত্যন্ত ভাবগ্রাহী বলে এখানে উল্লেখ করছি। ভক্ত প্রার্থনা করছেন : “হে শ্রীহনুমানজী, আমায় তিন চাকার সাইকেল দিন যা চালানো খুব সহজ। বৃদ্ধ, বিকলাঙ্গ এমনকি বাচ্চারাও চালাতে পারে। এই তিন চাকা হল ‘বল, বুদ্ধি ও বিদ্যা।’ আমার গতি চাই না, চাই শরণাগতি। আমি বুদ্ধিহীন বিকলাঙ্গ, বলহীন বিকলাঙ্গ এবং বিদ্যাহীন বিকলাঙ্গ।

আপনি বল, বুদ্ধি ও বিদ্যা দিন আর ক্লেশ ও বিকার হরণ করুন। হে হনুমান, আমার তো কোনো গতি নেই। আপনি কর্মের দেবতা, জ্ঞানের দেবতা। আপনি আমায় কর্ম করাতে চান তো আমার গতিহীনতার কারণ এই সতেরো ক্লেশ ও বিকার হরণ করুন আর ধীরে ধীরে পৌঁছনোর জন্য বা শরণাগতির জন্য তিন চাকার সাইকেল (বল, বিদ্যা, বুদ্ধি) দিন।”

দোঁহা

পবনতনয় সঙ্কট হরন, মঙ্গল মূরতি রূপ।
রাম লখন সীতা সহিত, হৃদয় বসহু সুর ভূপ॥

সারানুবাদ : হে পবনপুত্র! আপনি সঙ্কট বা বিপদ হরণকারী এবং মঙ্গলের মূর্তিময় স্বরূপ। হে সুরশ্রেষ্ঠ! শ্রীরাম, লক্ষ্মণ ও সীতার সাথে আপনি আমার হৃদয়ে বাস করুন।

ব্যাখ্যা : গোস্বামী তুলসীদাসজী হনুমান চালীসার শেষে তাঁর হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে শ্রীহনুমানজীর কাছে সকাতর প্রার্থনা নিবেদন করছেন। শ্রীহনুমানজীর সহিত তাঁর হৃদয়ে সদা অবস্থান করার প্রার্থনা জানাচ্ছেন। আর এই দোঁহাতে তিনি শ্রীহনুমানজীর কাছে প্রার্থনা করছেন যে, তিনি যেন প্রভু শ্রীরাম, ভাই লক্ষ্মণ, মাতা সীতাকে নিয়ে তাঁর হৃদয়ে সদা অবস্থান করেন। এই দোঁহাতে তিনি শ্রীহনুমানজীকে একবার সম্বোধন করলেন ‘পবনপুত্র’ বলে এবং অন্যবার বললেন ‘সুর ভূপ’ অর্থাৎ দেবতাদের রাজা।

বায়ুপুত্র হনুমান যে সর্বসঙ্কটহারী তার পরিচয় আমরা ‘চালীসা’য় বহুবার পেয়েছি। ‘সংকট মোচন হনুমানাষ্টক-‘এ তুলসীদাসজী বলছেন, “কাজ কিয়ে বড় দেবন কে তুম”। অর্থাৎ শ্রীহনুমানজী দেবতাদের অনেক কাজ স্বয়ং করে দিয়েছেন বা পরোক্ষভাবে সাহায্য করেছেন। তাই তাঁকে ‘সুর ভূপ’ বলা সঠিক হয়েছে। শ্রীহনুমানজী যখন যে কাজই করুন না কেন, তা সর্বদা তাঁর ভক্তের কল্যাণকারী হয় বা বিশ্বের কল্যাণসূচক হয়ে থাকে। তাই তিনি মঙ্গলের সাক্ষাৎ স্বরূপ।

একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, শ্রীহনুমানজীর উপস্থিতি বা তাঁর সাক্ষাৎ সর্বদাই সাক্ষাৎকারীকে ধন্যতার অনুভব করায়। যেমন শ্রীহনুমানজীর লঙ্কাপ্রবেশের সময় তাঁর মুষ্ট্যাঘাতে মৃতপ্রায় লঙ্কিনী তাঁর পরিচয় পেয়ে গদগদ কণ্ঠে বলেছিলেন, “হে তাত! আমার অনেক পুণ্যের কারণে আজ শ্রীরামের দূত আপনাকে আমি চাক্ষুষ দর্শন করলাম”। (রা:চ:মা:)

একই ভাবে শ্রীহনুমানজীর প্রথম দর্শনে পরিচয় পেয়ে লঙ্কাধিপতি রাবণের ভাই বিভীষণও আবেগরুদ্ধ কণ্ঠে বলে উঠেছিলেন, “যখন শ্রীরামচন্দ্রের কৃপা হল তখনই আপনি আমাকে কৃপাপূর্বক দর্শন দিলেন।” (রা:চ:মা:)
গোস্বামীজী তাই ‘চালীসা’র শেষে শ্রীহনুমানজীর কাছে প্রার্থনা করছেন যে প্রভু শ্রীরাম, লক্ষ্মণ এবং সীতার সঙ্গে আপনি সদা আমার হৃদয়ে অবস্থান করুন।

আসুন, ‘হনুমান চালীসা’ পাঠের শেষে আমরাও শ্রীহনুমানজীর পরমভক্ত এবং প্রখ্যাত কথাকারদের দ্বারা করা অত্যন্ত ফলপ্রসূ সেই প্রার্থনা করি :”হে হনুমানজী! এই গ্রন্থের পাঠকদের জিজ্ঞাসু হৃদয়ে আপনি সর্বদা প্রভু শ্রীরাম, লক্ষ্মণ এবং মাতা সীতার সঙ্গে বিরাজ করুন। আমরা সবাই আপনার বল, বুদ্ধি, বিদ্যা, শৌর্য, ধৈর্য এবং পরাক্রম থেকে যেন সর্বদা প্রেরণা পাই। আপনিই প্রভু শ্রীরামের কাজে আমাদের মার্গদর্শন করান। আপনার কাছে থাকা ‘রাম রসায়ন’ পেয়ে আমরা যেন অনন্ত শ্রদ্ধাবান হই। আশীর্বাদ করুন আমাদের আধ্যাত্মিক যাত্রা যেন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয় এবং কৃপালু প্রভু শ্রীরামের চরণ কমলে সদা স্থান হয়।”

শ্রীহনুমান : সংক্ষিপ্ত পরিচয়

হনুমান হলেন হিন্দুধর্মের একজন দেবতা যিনি রামের একনিষ্ঠ ভক্ত। পুরাণে হনুমানকে বিশেষ স্থান দেওয়া হয়েছে। রামায়ণ বর্ণিত হনুমান পবনন্দন হিসেবে হিন্দুদের নিকট পুজনীয়। রামায়ণের মূল চরিত্র রাম যাকে হিন্দুরা ভগবান বিষ্ণুর অবতার হিসেবে মনে করে তাঁর অনুগত চরিত্র হিসেবে পাওয়া যায় এই হনুমানকে। তিনি বায়ু দেবতার পুত্র। হিন্দুদের কাছে হনুমান রামভক্ত হিসেবে পরিচিত। রামায়ণের কাহিনী অনুসারে হনুমান সীতাকে উদ্ধারের জন্য লঙ্কায় অভিযান চালান এবং রামায়ণের বিভিন্ন চরিত্রকে কঠিন সঙ্কট হতে উদ্ধারে সাহায্য করেন।

এক নজরে :

উল্লেখ — রামায়ণে অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র
জন্মতিথি — চৈত্র পূর্ণিমা (উত্তর ভারতের প্রচলিত মত; দক্ষিণে ও বাংলায় অন্য তিথিও প্রচলিত)
মাতা ও পিতা — অঞ্জনা ও বানররাজ কেশরী (পবনদেব ও দেবাদিদেব শিবের অংশে জাত)
পুত্র — মকরধ্বজ (অহিরাবণ প্রসঙ্গে)
অস্ত্র — গদা ও মুষ্টি
বাহন — নেই
নামমাহাত্ম্য — সঙ্কটমোচন, অশুভ শক্তির বিনাশ, প্রভু শ্রীরামের কৃপালাভ
মন্ত্র — ওঁ হং হনুমতে রুদ্রাত্মকায় হুং ফট্
উৎসব — হনুমান জয়ন্তী
মন্দির —

  • তুলসীদাসজীর প্রতিষ্ঠিত সঙ্কটমোচন শ্রীহনুমানজীর মন্দির, বারাণসী,
  • সঙ্কটমোচন হনুমান মন্দির, ফিলাউর, পাঞ্জাব,
  • চিত্রকূট মন্দির, মধ্য ভারত,
  • জাখু মন্দির, শিমলা, হিমাচলপ্রদেশ,
  • শ্রীলঙ্কা ও
  • দেশবিদেশব্যাপী অসংখ্য মন্দির

মূর্তি

  • প্রাচীন : খাজুরাহোর হনুমান মূর্তি (৯২২ খ্রিস্টাব্দ), গহিলের পুত্র গোল্লক কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত
  • ৪১ মি. উঁচু বীর হনুমান মূর্তি, পরিটালা, অন্ধ্রপ্রদেশ,
  • বালির পুরা (মন্দির), ইন্দোনেশিয়ার মূর্তি,
  • তামিলনাড়ুতে একাদশ শতাব্দীতে চোল বংশ প্রতিষ্ঠিত হনুমান মূর্তি ও
  • দেশবিদেশব্যাপী অসংখ্য মূর্তি

হনুমান নামের উৎস ও বিভিন্ন নাম :

হনুমান নামটি এসেছে হনু (“চোয়াল”) এবং মান (“বিশিষ্ট” বা “কদাকার”) শব্দদ্বয় থেকে। অর্থাৎ “হনুমান” শব্দার্থ “কদাকার চোয়ালবিশিষ্ট”। অপর একটি সূত্র বলে হনুমান নামটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ হন (“হত্যা”) এবং মানা (“গর্ব”) থেকে। অর্থাৎ হনুমান অর্থ “যাঁর গর্ব হত হয়েছে”। কিছু জৈন গ্রন্থ থেকে জানা যায় হনুমান তাঁর শৈশব ‘হনুরাহা’তে কাটিয়েছেন এবং তাই তাঁর নাম হনুমান।

অপর একটি তথ্যানুসারে, “হনুমান” নামটি দ্রাবিড় শব্দ ‘আণ-মন্তি’ (পুরুষ বানর) থেকে এসেছে, যা পরবর্তীতে সংস্কৃতে “হনুমান” হয়। “হনুমান” শব্দের ভাষাগত রূপভেদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে হনুমাত, অনুমান (তামিল), অনোমান (ইন্দোনেশীয়), আন্দোমান (মালয়) এবং হুনলামান (লাও)। এছাড়া আরও রয়েছে:

  • আঞ্জনেয়, অঞ্জনিপুত্র বা আঞ্জনেয়ুডু / হনুমন্তুডু (তেলুগু), যার অর্থ “অঞ্জনার পুত্র”
  • আঞ্জনেয়ার, গ্রামীণ তামিলীয়রা ব্যবহার করে।
  • কেশরী নন্দন (“কেশরী”পুত্র)
  • মারুতি (“মরুতের পুত্র”) বা পবনপুত্র ; এই নামগুলি বায়ুদেবের বিভিন্ন নাম থেকে এসেছে।
  • বজরংবলী (বজ্রাঙ্গবলী) — “বজ্রের মতো অঙ্গবিশিষ্ট বলশালী”; উত্তর ভারতে এই নাম বহুল প্রচলিত।

মহাভারতে হনুমান :

মহাবীর হনুমান ‘রামায়ণ’-এর চরিত্র। তিনি অমর। তাই পরবর্তী মহাকাব্য ‘মহাভারত’-এও তাঁর সাবলীল উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। এই মহাকাব্যে তিনি কেমন যেন এক ধীর-শান্ত ব্যক্তিত্ব। তাঁর বীরভাব এখানেও বজায় রয়েছে বটে। কিন্তু তার উপরে প্রলেপ পড়েছে জ্ঞানের, অভিজ্ঞতার।

হনুমান এবং ভীম দু’জনেই পবনপুত্র। সেদিক থেকে দেখলে, তাঁরা ভ্রাতা। পাণ্ডবদের বনবাসের সময়ে হনুমান এক অসুস্থ এবং বৃদ্ধ বানরের বেশে ভীমকে দেখা দেন। ভীম ছিলেন অসম্ভব আত্মগর্বী। তাঁকে শিক্ষা দেওয়াই ছিল বজরং বলীর উদ্দেশ্য। ভীমের পথ রুদ্ধ করে অসুস্থ বৃদ্ধের ছদ্মবেশে হনুমান শুয়ে ছিলেন। ভীম তাঁকে অতিক্রম করতে চাইলে তিনি ভীমকে বলেন তাঁর লেজটি সরিয়ে চলে যেতে। ভীম বহু চেষ্টাতেও সেই লেজ সরাতে পারেননি। শেষে তিনি অনুভব করেন, এই ব্যক্তি কোনো সাধারণ বানর নন। তিনি হনুমানের শরণ নেন।

হনুমানের সঙ্গে অর্জুনেরও দ্বৈরথ ঘটেছিল। সেতুবন্ধ রামেশ্বরমে অবস্থানকালে অর্জুন এক ক্ষুদ্র বানরের সম্মুখীন হন। অর্জুন সেই বানরের সামনে গর্ব ভরে বলেন, বানরদের সাহায্য না নিয়ে রামচন্দ্র একাই সেই সমুদ্র-সেতু নির্মাণ করতে পারতেন। তীর দিয়েই তো সেটা করা সম্ভব ছিল। ক্ষুদ্র বানর অর্জুনকে আহ্বান জানায় ওই কাজ করে দেখাতে। অর্জুন ব্যর্থ হলে ক্ষুদ্র বানরের ছদ্মবেশ ত্যাগ করে হনুমান প্রকট হন। অর্জুন তাঁর শরণ নিলে, তিনি অর্জুনের রথশীর্ষে অধিষ্ঠান করবেন বলে বর দেন। অর্জুনের রথের উপরে তাই ‘কপিধ্বজ’ শোভা পায়।

লোকবিশ্বাস অনুযায়ী মাত্র কয়েকজন শ্রীকৃষ্ণের মুখ থেকে ভগবদ্গীতা শুনেছিলেন — অর্জুন, সঞ্জয় (দিব্যদৃষ্টিতে) এবং বর্বরিক (ঘটোৎকচের পুত্র)। আর ধ্বজ হিসেবে রথশীর্ষে অবস্থানের কারণে হনুমানও ছিলেন সেই তালিকায়।

অন্যান্য কীর্তি :

(১) পঞ্চমুখী রূপ ধারণ : রাবণের ভাই মহিরাবণ ও অহিরাবণ যখন রাম ও লক্ষ্মণকে পাতালে বন্দী করে রাখে, তখন হনুমান পঞ্চমুখী রূপ ধারণ করে পাঁচদিকে জ্বলন্ত পাঁচটি প্রদীপকে একই সঙ্গে নিভিয়ে দুই রাক্ষসকে হত্যা করে রাম ও লক্ষ্মণকে উদ্ধার করেন।

(২) সাহিত্য কীর্তি : কথিত আছে, রামের রাবণ জয়ের পর হনুমান হিমালয়ে বসে শ্রীরামের সমস্ত কীর্তি তাঁর নখ দিয়ে লিখে ‘হনুমৎ রামায়ণ’ নামে এক সাহিত্য রচনা করেন। পরে মহর্ষি বাল্মীকি সেই রচনা দেখে অত্যন্ত বিমর্ষ হয়ে পড়েন। হনুমান এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন যে ‘হনুমৎ রামায়ণ’ এত উৎকৃষ্ট রচনা যে তার কাছে বহু পরিশ্রমে লেখা তাঁর রামায়ণ কিছুই নয়।

এই শুনে হনুমান ‘হনুমৎ রামায়ণ’ পরিত্যাগ করেন। এতে বাল্মীকি লজ্জিত হয়ে বলেন যে হনুমানের যশোগান যা তাঁর রামায়ণে অনুক্ত রয়ে গেল, তা গাইবার জন্য তাঁকে আরও একবার জন্ম গ্রহণ করতে হবে। মনে করা হয় যে মহর্ষি বাল্মীকি পরবর্তী জন্মে গোস্বামী তুলসীদাসজী রূপে বিখ্যাত হন।

বলা হয় ‘হনুমৎ রামায়ণ’-এর একটি অংশ মহাকবি কালিদাসের সময়ে নদীতীরে পাওয়া যায় যা পেয়ে তিনি নিজেকে ধন্য মনে করেন এবং বিলুপ্ত হরফে লেখা অংশটির পাঠোদ্ধার করেন।

ఇవి కూడా చదవండి

Chalisa – చాలీసాచాలీసాలు, హిందూ ధర్మప్రకారం మూడుతల్లుగా రూపొందించే దివ్యాత్మ ప్రార్థనా స్తోత్రాలు, ఆధ్యాత్మిక చర్యలులో ప్రముఖ స్థానం ధరించుకొనుచున్నాయి. ఈ స్వర్గీయ రచనలు, కవిత్వ సౌందర్యం మరియు ఆళ్…హనుమాన్ చాలీసా | Hanuman Chalisa Lyrics“శ్రీ హనుమాన్ చాలీసా ” అనగా హనుమంతుని నలుబది: నలభై చౌపాయిలలో శ్రీ హనుమంతుని కీర్తిని వివరించు స్తోత్రము. దీనిని గోస్వామి తులసీదాసు అవధీ (హిందీ) భాషలో రచించారు. ప్రతి జీవియు లోకమున …Hanuman Chalisa In Telugu – హనుమాన్ చాలీసాగోస్వామి తులసీదాసు అవధీ (హిందీ) భాషలో రచించిన హనుమాన్ చాలీసా ను మనం ఎక్కువగా వింటూ ఉంటాము. సుందరదాసు శ్రీ ఎం.ఎస్. రామారావు గారు 1972–74 మధ్య మనందరి కోసం తెలుగులో రచించిన హనుమాన్ చా…Hanuman Chalisa Pdf, Shri Hanuman Chalisa Lyrics, Jai Hanuman Chalisa Meaning in EnglishPerhaps the most powerful meditation or the most popular hymn in the land of India is the Hanuman Chalisa. Breaking all barriers of diversity, everyone in India can either recite t…Hanuman Chalisa Chaupai 1 Meaning in EnglishThe Hanuman Chalisa is a revered devotional hymn dedicated to Lord Hanuman. Hanuman Chalisa Chaupai 1 in English with Meaning & Analysis Hanuman Chalisa Chaupai 1 Why Monkey as God…Hanuman Chalisa Chaupai 2 Meaning in EnglishDevotees around the world recite the Hanuman Chalisa Lyrics with deep reverence. Hanuman Chalisa Chaupai 2 in English with Meaning & Analysis Hanuman Chalisa Chaupai 2 Son of Wind …